গুলিস্তানের কামান।

একসময় ঢাকা নগরের আত্মপরিচয়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল গুলিস্তানের কামান। গুলস্তান সিনেমা হলের সামনে এই কামানটা স্থাপিত হয়েছিল। এখনো এই কামানটা ঢাকা শহরে আছে তবে সেটা ওসমানী উদ্যানে সংরক্ষন করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের লড়াই সংগ্রামের উত্তাল সময়গুলোতে ছাত্র আর রাজনৈতিক নেতারা গুলিস্তানের কামানের উপরে উঠে বক্তৃতা দিতেন।

এই কামানটা ঢাকায় স্থাপন করেছিলেন মীর জুমলা। মীর জুমলা ছিলেন আওরংগজেবের বিশ্বস্ত সেনাপতি। একটা নয় তিনি দুটো কামান বানিয়েছিলেন। একটা বড় কাটরার সামনের গেটের জন্য আরেকটা বড় কাটরার ভিতর স্থাপনের জন্য। একটা কামানের নাম দিয়েছিলেন “বিবি মরিয়ম” আরেকটা কামানের নাম দিয়েছিলেন “কালু জমজম” ঢাকার কালেক্টর ওয়াল্টার ১৮৩২ সালে বিবি মরিয়মকে বড় কাটরা থেকে নিয়ে চকবাজারে স্থাপন করেন। পরে তা সদরঘাটে স্থাপন করা হয়। ১৯৫৭ সালে ডি আই টির চেয়ারম্যান জি এ মাদানি কামানটাকে গুলিস্থানে স্থাপন করেন। গুলিস্তানের কামানটা আসলে সেই বিবি মরিয়ম। আর কালু জমজম? ওই কামানটা রাখা হয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। নদী ভেঙ্গে কামানটা নদীর গর্ভেই হারিয়ে যায়।

মীর জুমলা ১৬৬০ সালে বাংলার সুবাদার হয়ে আসেন। দেড় বছর বাংলার শাসন চালান। তার আসল নাম ছিল মোহাম্মদ সাদ। ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। ভাগ্যের সন্ধানে ভারতে আসেন এবং গোলকেন্ডার সুলতান কুতুব শাহের অধীনে কাজ শুরু করেন। কুতুব শাহের উজিরও হয়েছিলেন মীর জুমলা। পরে সুলতানের চাকরী ছেড়ে দিয়ে হীরা ব্যবসায়ে মন দেন। তিনি যেই হীরার খনি কিনেছিলেন সেখানেই পাওয়া যায় বিখ্যাত কোহিনুর। কোহিনুর হীরা সম্রাট শাজাহানকে উপঢৌকন দিয়েই সবার নজর কাড়েন তিনি। সম্রাট শাজাহানই তাকে মীর-ই-জুমলা মানে পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত রাজদূত বানান। মীর জুমলা কোন উপাধী নয়, এটা রাজপদবী। তবে মীর জুমলার একটা উপাধী ছিল, মুয়াজ্জম খান । সেই উপাধী কেউ মনে রাখেনি।

মীর জুমলা সুবাদার হয়ে আসার পরে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। মাত্র দেড় বছরে তিনি মুন্সিগঞ্জ, ফতুল্লা আর নারায়নগঞ্জে তিনটা দুর্গ তৈরি করেন, পাগলায় ব্রিজ তৈরি করে ঢাকা আর নারায়নগঞ্জকে মহাসড়কে যুক্ত করেন। টঙ্গিতে আমরা যে পুরোনো ব্রিজ দেখি ওইখানেও একটা ব্রিজ তৈরি করেছিলেন মীর জুমলা।

মীর জুমলা আর দিল্লীতে ফিরে যেতে পারেননি, এই বাংলাতেই শেষ শয্যা পেতেছেন। তিনি আসামের গৌহাটিতে সামরিক অভিযান শেষে নৌকায় ফিরতে গিয়ে নারায়নগঞ্জের কাছে খিজিরপুরে নৌকার মধ্যেই মারা যান। খিজিরপুরেই তাকে দাফন করা হয়। তার কবর আর চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

ঢাকা নগর হয়ে ওঠার সাথে মীর জুমলা নামের এই ভিনদেশী শাসকের গভীর সম্পর্ক আছে। তিনি আরো কিছুদিন বেচে থাকলে ঢাকা নগর হিসেবে আরো ঐশ্বর্যশালী হয়ে উঠতে পারতো।

এবার কামান নিয়ে একটা কৌতুক শুনুন,

সামরিক অস্ত্র প্রদর্শনী চলছে। রফিকও গেছে সেখানে। হঠাৎ রাইফেলের একটা গুলির আওয়াজে ভড়কে গিয়ে প্রদর্শনী দেখতে আসা সুন্দরী তরুণী চিৎকার দিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো রফিককে জড়িয়ে ধরল। একটু ধাতস্ত হবার পর ঘটনাটি বুঝতে পেরে লজ্জাতে লাল হয়ে তরুণীটি দুঃখ প্রকাশ করে বললঃ আমি সত্যি লজ্জিত,আসলে গুলির আওয়াজে এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম…!

রফিক মুচকি হেসে বললঃ

 

-না না ঠিক আছে, চলুন আপনাকে পাশের মাঠ থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি, ওখানে কামান দাগা চলছে!

Share

One Response

Leave a Reply to Abu Saed Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Feeling social? comment with facebook here!

Subscribe to
Newsletter