আধুনিক হিন্দী ভাষার বয়স ১৫০ বছরের কাছাকাছি। এই ভাষাকে স্থানীয় অনেক ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে। ভারতে নেইশন স্টেইট বানানোর জন্য যে তিনটি মুল স্তম্ভকে বেছে নেয়া হয় তার একটি হিন্দু ধর্ম, একটি হিন্দি ভাষা আরেকটি হিন্দুস্তান বলে একটি কাল্পনিক ভুখণ্ড। এই ভাষার উদ্ভব এবং বিকাশের সাথে জড়িয়ে আছে হিন্দু মহাসভার নাম।
দিল্লি এবং এর পাশের অঞ্চলের সাধারণ মানুষের যে ভাষা ছিলো তাকে হিন্দি বলয়ের বাইরের মানুষেরা বলতো হিন্দবি বা হিন্ধি। আর নিজেরা এই ভাষাকে বলতো খড়ী বোলি বা চালু ভাষা। দিল্লি ছাড়া উত্তর ভারতের অন্যান্য অংশে ব্রজভাষা, ডিঙ্গল, মেওয়ারি, আবধী, মাগহি, ভোজপুরি, মৈথিলি এই ভাষাগুলো ব্যবহৃত হতো। সবগুলোই খুব সমৃদ্ধ ভাষা ছিলো। কবীরের বচন ছিলো ব্রজভাষায় রচিত, মীরার ভজন ডিঙ্গলে, আবধীর কবি ছিলেন বিখ্যাত তুলশি দাস, মৈথেলি ভাষায় বিদ্যাপতি আর গোবিন্দ। কিন্তু আপনি আজকে কোন ভাষাই আর খুঁজে পাবেন না। হিন্দি সব ভাষাকে সিস্টেমিকভাবে মুছে দিয়েছে। মুছে দিয়েছে তাঁদের অমুল্য সাহিত্যের কথাও।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে হিন্দির আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভব হয় কোলকাতাতেই আর আজকে এই কোলকাতাতেই হিন্দির দাপটে বাঙলার ত্রাহি ত্রাহি দশা। হিন্দি ভাষার প্রসার এবং তাকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়া হয় হিন্দু মহাসভার মাধ্যমে।
উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ইংল্যান্ড থেকে আগত ইংরেজ কর্মচারিরা এখানকার চাপরাশি, সহিস, জমাদার এইধরনের ভৃত্যস্থানীয় কর্মচারিদের সাথে ও দোকানদার, ফেরিওয়ালা এদের সাথে কথা বলার জন্য যে ভাষার চর্চা করতো তা ছিল এই দিল্লির খড়ি বোলি, ইংরেজরা তাকে হিন্দি বলতো। এই কথ্য ভাষাকে সংস্কার করে লিখিত ভাষার রূপ দেন জেমস গিলগ্রিস্ট নামের এক ইংরেজ। কলকাতা শহরেই প্রথম হিন্দি পত্রিকা প্রকাশিত হয় “উদন্ত মার্তণ্ড” নামে। তখনো পর্যন্ত হিন্দির জন্য বিশেষ কোন লিপি স্বীকৃত বা গৃহীত হয়নি। ব্রাহ্মসমাজের কেশবচন্দ্র সেন যখন তার নতুন মতবাদ প্রচারের জন্য সারা ভারত ঘুরছিলেন তখন তিনি উপলব্ধি করেন সারা দেশের মানুষ নানা বিচিত্র ভাষায় কথা বলে, এক অঞ্চলের ভাষা আরেক অঞ্চলের মানুষ বুঝতে পারেন না। তিনি আশ্রয় করেন হিন্দি ভাষার এবং “সুলভ সমাচার” পত্রিকার মাধ্যমে হিন্দিতে তার মতবাদ সারা ভারতে প্রচার করতে শুরু করেন। এরপরে কোলকাতায় আসেন আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী একটা বক্তৃতা দিতে। তিনি ছিলেন গুজরাটি কিন্তু শিক্ষিত সমাজের মাঝে বক্তৃতা দিতে হলে বক্তৃতা দিতেন সংস্কৃতে। এসে দেখলেন এখানে কেশবচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সবাই হিন্দিকে সামাজিক স্বীকৃতি দিচ্ছেন। এটা দেখে দয়ানন্দ সরস্বতী কোলকাতায় নিজের বক্তৃতাটা দেন হিন্দিতে। এরপরেই তিনি প্রস্তাব করেন হিন্দি নাগরি লিপিতে লেখা যেতে পারে। নাগরি লিপি হচ্ছে সেই লিপি যা দিয়ে গুজরাটি ব্রাহ্মণেরা সংস্কৃত চর্চা করতেন।
১৮৯০ সালে মদনমোহন মালব্য বারানসিতে নাগরী প্রচারণা সভা স্থাপিত করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিলো হিন্দির জন্য নাগরী লিপির স্বীকৃতি আদায় আর অফিস আদালতে আরবি-ফার্সির পরিবর্তে হিন্দি ব্যবহারের জন্য আন্দোলন সংগঠন করা। ১৯২৩ সালে বারানসিতে হিন্দু মহাসভার একটি সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে নাগরী প্রচারণা সভা ছিলো কো স্পন্সর বা সহ আয়োজক। এভাবেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সাথে হিন্দির গাঁটছড়া বাধা হয়। আর নাগরী লিপিতে দেবত্ব আরোপের জন্য নাগরীর আগে “দেব” শব্দটা জুড়ে দিয়ে “দেব-নাগরী” বানানো হয়। এই সভাতেই আর এস এসের ভাবজনক ডঃ মুঞ্জের হিন্দু স্বরাজের তিনটি মুলসুত্রের তত্ব গৃহীত হয়। এই তিনটি মুলসুত্র হচ্ছে হিন্দু সমাজ, হিন্দু ধর্ম ও হিন্দি ভাষা। হিন্দু মহাসভা এরপরে শুরু করে হিন্দি ভাষা শুদ্ধিকরন অভিযান। এই শুদ্ধিকরণের মাধ্যমে হিন্দি থেকে আরবী আর ফার্সি ভাষার শব্দকে সরিয়ে শব্দ ব্যকরন ও ধ্বনি সবদিক থেকেই হিন্দিকে সংস্কৃতের অনুরুপ করানো হয়। তখন থেকেই উর্দুভাষীদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান ভেদ সৃষ্টি হল। আগে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে উর্দু ভাষায় কথা বলতেন। লালা লজপত রায় ছিলেন এই হিন্দি প্রসারের একজন কর্মি, তিনি তার অটোবায়োগ্রাফিক্যাল রাইটিংস এ লিখেছেন, এই হিন্দি প্রসারের কাজ করাতে তার উর্দুভাষি বাবা তার উপরে খুব ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। এমনকি যে সমস্ত হিন্দুরা সেইসময় দ্বিধান্বিতভাবে হিন্দি চর্চা শুরু করেছিলেন তাঁরা নাগরী লিপির বদলে আরবি বা ফার্সি লিপিতেই হিন্দি লিখতেন।
এমনকি প্রতিভাবান হিন্দু ধর্মাবলম্বী উর্দু সাহিত্যিকেরাও সামাজিক চাপে এইসময় থেকে উর্দু ছেড়ে হিন্দিতে লিখতে শুরু করেন। প্রখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচাদ একজন উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে হিন্দিতে লিখতে শুরু করার পরে তিনি যা যা লিখেছেন তা তার উর্দু কর্মকে অতিক্রম করে যেতে পারেনি। ভাষার রাজনীতি মুন্সি প্রেমচাদের মতো সাহিত্যিককেও বলি দিয়ে দিতে পারে।
হিন্দির এই সর্বব্যাপী আগ্রাসনের ফলেই ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানের কাছে উর্দু হয়ে দাঁড়ালো তাঁদের আত্মপরিচয়, আর পাকিস্তান রাষ্ট্রকল্প তাঁদের কাছে হয়ে দাঁড়ালো হিন্দির দাপট থেকে মননের মুক্তাঞ্চল।
লেখাটির ফেইসবুক ভার্সন পড়তে চাইলে এইখানে ক্লিক করুন


