“কার্ল মার্ক্সের মুল প্রস্তাবনা ছিল প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক বিচার। মার্ক্স বলেছিলেন, মানুষ প্রকৃতির সাথে উৎপাদনের সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে। এটাকেই বলেছিলেন উৎপাদন সম্পর্ক।”
কয়দিন আগে একটা ফেইসবুক স্ট্যেইটাসে আমি এটা লেখায় জানতে চাওয়া হয়েছে মার্ক্স এটা কোথায় বলেছেন? প্রশ্নের ধরনটা খুব কৌতূহল উদ্দীপক। ঠিক ধর্ম বাদীদের মতো জানতে চাওয়া, এই কথা কোন আয়াতে বা শ্লোকে আছে। মার্ক্সের যারা পাঠক তাঁরা নিশ্চয় জানেন মার্ক্স নিজেকে নিয়তই বদলেছেন। মার্ক্স কোন একাট্টা স্থির বিষয় নয় যার সবকিছুই টেক্সটে খুজে পাওয়া যাবে। পুঁজি গ্রন্থ লিখতে গিয়ে উনার প্রাণশক্তির অধিকাংশ ব্যয়িত হয়ে যাওয়ায় তিনি যা যা লিখতে চেয়েছিলেন সেটা তিনি শেষ করতে পারেননি। নিজের লেখাতেও এই চিন্তার বিবর্তন ধরা পড়েছে। যেমন ধরুন কমিউনিস্ট ইশতেহারে “শ্রেণী” আছে দুটো আবার পুঁজিতে “শ্রেণী” আছে তিনটে। তাহলে মার্ক্সের মতে পুজিবাদে শ্রেণী কয়টা? মার্ক্স তাই সবসময় সৃজনশীল পাঠ। এটা মার্ক্সেরই শিক্ষা। মার্ক্স পাঠের সময় এটা মাথায় রাখতে হবে মার্ক্স ছিলেন হেগেলের শিষ্য আবার ফয়েরবাখের অনুবর্তী তাই জর্মন দর্শনে চিন্তার যেই প্রশ্ন গুলো হেগেল বা ফয়েরবাখ ফয়সালা করতে চেয়েছেন সেটার পরম্পরা ক্রিটিক বা বিচার অর্থে মার্ক্সের লেখায় আছে। ক্যাপিটাল বইয়ে সাত অধ্যায়ে প্রথম পরিচ্ছদে মার্ক্স লিখছেন,
“শ্রম হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে মানুষ এবং প্রকৃতি উভয়েই অংশ গ্রহন করে, এবং যেখানে মানুষ স্বেচ্ছায় তার নিজের এবং প্রকৃতির মধ্যেকার মিথস্ক্রিয়ার (metabolic interaction with nature) সূচনা করে, নির্ধারন করে, নিয়ন্ত্রন করে। প্রকৃতির উৎপাদন –সমূহকে তার বিবিধ অভাবের সঙ্গে উপযোজিত আকারে আত্নীকৃত করার উদ্দেশ্যে সে নিজেকে প্রকৃতির বিপরীতে স্থাপন করে প্রকৃতিরই অন্যতম শক্তি হিসাবে। এইভাবে বাহ্য জগতের উপরে কাজ করে এবং তাকে পরিবর্তিত করে, সে সঙ্গে তার নিজের প্রকৃতিরও পরিবর্তন ঘটায়। সে তার সুপ্ত শক্তিগুলিকে বিকশিত করে এবং সেগুলিকে বাধ্য করে তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে।“
মানুষ শ্রমের মাধ্যমে প্রকৃতির সাথে যুক্ত থাকে, এবং প্রকৃতির সাথে যুক্ত থাকলেই সেটা শ্রম নচেৎ নয়। প্রকৃতির শক্তি হিসেবেই মানুষ নিজেকে প্রতিস্থাপন করে। মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াই শ্রম। Marx and the Rift in the Universal Metabolism of Nature শিরোনামে প্রবন্ধে মার্ক্স লিখিত মেটাবোলিজম বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য John Bellamy Foster লিখেছেন।
“Marx’s use of the metabolism concept in his work was not simply (or even mainly) an attempt to solve a philosophical problem but rather an endeavor to ground his critique of political economy materialistically in an understanding of human-nature relations emanating from the natural science of his day.”
“মার্ক্স তাঁর কাজে মেটাবলিজম শব্দটা ব্যবহার করেছেন শুধুমাত্র (অথবা প্রধানত) একটা দার্শনিক সমস্যার সমাধানের জন্যই নয় বরং অর্থশাস্ত্রের বস্তুবাদি বিচারের একটি ভিত্তি তৈরির জন্য যেন আজকের দুনিয়ার প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের উদ্ভুত মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্ককে বুঝা যায়।“
মার্ক্স ক্যাপিটালে “metabolic rift” (Karl Marx, Capital, vol. 3 (London: Penguin, 1981), 949.) শব্দটা ব্যবহার করেছেন মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বিচারে। (Paul Burkett, Marx and Nature (New York: St. Martin’s Press, 1999)
মার্ক্স উৎপাদন সম্পর্ক বিষয়টা প্রথমে লেখেন জার্মন ভাবাদর্শে, এরপরে দর্শনের দারিদ্র বইয়ে। আবার এই প্রসঙ্গ এসেছে অর্থশাস্ত্র বিচারের ভুমিকা গ্রন্থে এবং সর্বশেষে ক্যাপিটালের তৃতীয় খন্ডে ৪৮ অধ্যায়ে ও পরিশেষে Wage Labour and Capital’ পুস্তিকায়। অর্থশাস্ত্র বিচারের ভুমিকা গ্রন্থে উৎপাদন সম্পর্ক বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও সুনির্দিষ্ট কিছু ছিলনা। জর্মন ভাবাদর্শের ইংরেজি অনুবাদের সম্পাদক লিখছেন,
“মার্কস ও এঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে বস্তুগত বিনিময়- সম্পর্ক ও সর্বোপরি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষের বিনিময়- সম্পর্কই প্রত্যেক অন্য আর সব বিনিময়- সম্পর্কের রূপের ভিত্তি গড়ে দেয়।Verkehrsform’(বিনিময়- সম্পর্কের রূপ), ‘Verkehrsweise’ (বিনিময়- সম্পর্কের ধরণ), “Verkehrsverhaltnisse” (বিনিময়- সম্পর্কের পারস্পরিক সম্পর্ক বা শর্ত), এবং “Produktions-und Verkehrsverhaltnisse” (উৎপাদন ও বিনিময় সম্পর্কেরপারস্পরিক সম্পর্ক বা শর্ত), এসব শব্দাবলীর যা ঐসময়কালে তাঁদের মাথায় দানা বাঁধছিল তা মার্কস ও এঙ্গেলসের হাতে জর্মান ভাবাদর্শে ব্যবহৃত হয়েছে ‘উৎপাদন সম্পর্কের ধারণা হিসাবে। পরবর্তীকালে মার্কসের রচনায় এসব ধারণা “উৎপাদন সম্পর্ক”শব্দ ব্যবহার করে রচিত হয়েছে।“
সম্পাদকের এই ভাষ্য উল্লেখের কারণ হচ্ছে এই জর্মন ভাবাদর্শ মার্ক্স বা এঙ্গেলসের জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। যখন এই পুরনো পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা হয়েছিলো তার অনেকটাই পোকায় কেটে নষ্ট করেছিল। তাই সম্পাদকের ভুমিকা এখানে ছিল ক্রুসিয়াল।
দর্শনের দারিদ্র্যে উৎপাদন সম্পর্ক সম্পর্কে মার্ক্স লিখেছেন,
“এম. প্রুধোর ন্যায় অর্থনীতিবিদ খুব ভাল করেই বোঝেন যে, উৎপাদনের নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে মানুষ কাপড়-চোপড়, পাট বস্ত্র, শণ বস্ত্র কিম্বা রেশমি দ্রব্যসামগ্রী প্রস্তুত করে থাকে। কিন্তু যা তিনি বোঝেননি তা হলো এই যে, এই সব সুনির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক ঠিক যেমন মানুষের দ্বারা উৎপন্ন হয় তেমনিভাবে উৎপন্ন হয় পাট, শন, ইত্যাদির দ্বারাও। সামাজিক সম্পর্কগুলো উৎপাদিকা শক্তিসমূহের সীমানায় সীমাবদ্ধ। নতুন উৎপাদিকা শক্তি অর্জন করতে গিয়ে মানুষ তাদের উৎপাদন প্রনালী পরিবর্তন করে; এবং তাঁদের উৎপাদন প্রনালী পরিবর্তন করতে গিয়ে, তাঁদের জীবিকা অর্জনের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে গিয়ে তারা তাঁদের তামাম সামাজিক সম্পর্ক পরিবর্তন করে থাকে।”
ক্যাপিটালের তৃতীয় খন্ডে ৪৮ অধ্যায়ে মার্ক্স লিখেছেন,
“ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে সাধারণভাবে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ার একটি ঐতিহাসিক ভাবে নির্ধারিত রূপ। পরবর্তীটি যে পরিমাণে মানব জীবনের বস্তুগত অবস্থাবলির উৎপাদন – প্রক্রিয়া সেই পরিমাণে সেটি এমন একটি প্রক্রিয়া এমন একটি প্রক্রিয়া, যা ঘটে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক উৎপাদন সম্পর্কের অধীনে, উৎপাদন ও ও পুনরুৎপাদন করে খোদ এই উৎপাদন সম্পর্ক সমূহকে, এবং সেইসঙ্গে এই প্রক্রিয়ার বাহকগুলিকে, তাঁদের অস্তিত্বের বস্তুগত অবস্থাবলি ও পারস্পরিক সম্পর্ক সমূহকে, অর্থাৎ তাদের বিশেষ সামাজিক অর্থনৈতিক রূপটিকে। কেননা সম্পর্কসমূহের, এই যে সর্বমোট সমষ্টি, যার মধ্যে প্রকৃতিও ও পরস্পরের প্রতিপ্রেক্ষিতে এই উৎপাদন প্রতিনিধিবর্গ অবস্থান করে, এবং যার মধ্যে তারা উৎপাদন করে, তা-ই হচ্ছে সমাজ-যদি তাকে বিচার করা যায় তার অর্থনৈতিক কাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকে। “
কার্ল মার্ক্স তাঁর ‘Wage Labour and Capital’ পুস্তিকার ‘The Nature and Growth of Capital’ অধ্যায়ে “উৎপাদন সম্পর্ক” বিষয়ে তাঁর ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন
“In the process of production, human beings work not only upon nature, but also upon one another. They produce only by working together in a specified manner and reciprocally exchanging their activities. In order to produce, they enter into definite connections and relations to one another, and only within these social connections and relations does their influence upon nature operate — i.e., does production take place.”
“উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় মানুষ শুধু প্রকৃতির ওপর কাজ করে না, তারা একে অন্যের ওপরও কাজ করে। তারা উৎপাদন করে কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট কায়দায় ও নির্দিষ্ট প্রকারে পরস্পরের মধ্যে তাদের বিনিময় তৎপরতার মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করার ভেতর দিয়ে। উৎপাদনের জন্যে তারা একের সাথে অন্যে নির্দিষ্ট সংযোগ ও সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে এবং একমাত্র ঐ সামাজিক সংযোগ ও সম্পর্কই প্রকৃতির ওপর তাদের প্রভাব ফেলতে পারে অর্থাৎ উৎপাদন হতে পারে।”
উৎপাদন সম্পর্ক মানে যে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক সেটা এখানে মার্ক্স স্পষ্ট করেছেন।
মার্ক্সের মুল চিন্তার জন্য জর্মন ভাবাদর্শ খুব গুরুত্বপূর্ণ। জর্মন ভাবাদর্শ পড়লেই বুঝতে পারা যায় মার্ক্স “পুঁজি” তে কী লিখবেন। তিনি কোথায় জর্মন ভাবাদর্শ এবং তাঁর গুরু হেগেল থেকে প্রস্থান করছেন আর কোন নতুন জ্ঞান কাণ্ডে প্রবেশ করছেন।
জার্মান ভাবাদর্শিক ধারার মধ্যে চেতনা ও বস্তু কিম্বা সোজা কথায় চেতনা সম্পন্ন মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বিচার দর্শন বা জ্ঞান তাত্ত্বিক রূপ নিয়েছিল। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ককে জ্ঞানের সম্পর্কের মধ্যে বিবেচনা চলছিল। সেই বিবেচনা মানুষের দিক থেকে – অর্থ্যাৎ জ্ঞানের কর্তা হিশাবে মানুষ প্রকৃতিকে যেভাবে দেখে, বোঝে, বিচার করে সেই অবস্থান থেকে বিবেচনা। মার্কস জ্ঞানতাত্তিক জায়গা থেকে ‘সম্পর্ক’কে মানুষের বাইরের বস্তুময় জগতে স্থাপন করলেন, জ্ঞানচর্চাকারী মানুষকে জার্মান দার্শনিকদের মতো কর্তা ভাবলেন না তিনি। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক তাঁর কাছে জ্ঞানতাত্তিক সম্পর্ক না থেকে হয়ে উঠল ‘উৎপাদন সম্পর্ক’ ঃ ভোগ, উৎপাদন, বিতরণ ও বিনিময়ের সম্পর্ক। মানুষ হয়ে উঠল উৎপাদন সম্পর্কের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল। উৎপাদনের ইতিহাস হিয়ে উঠল মানুষের ইতিহাস। জার্মান ভাবাদর্শিক ধারার বিপরীতে দাঁড়ানো বস্তুবাদী ধারার মতো মার্কস প্রকৃতিকে কর্তা সাব্যস্ত করননি ঠিক, কিন্তু হেগেলের একনিষ্ঠ হবার কারণে তিনি বুঝেছিলেন মানুষ যেমন নয়,তেমনি প্রকৃতি বা বস্তুজগতও ইতিহাসের কর্তা নয় বরং উভয়ের ‘প্রাণরাসায়নিক’ আদান প্রদানের গতিশীল সম্পর্ক এবং স্তর রূপান্তরই এখানে ‘কর্তা’।
এই সম্পর্ক কোন স্থির ও অনড় কিছু নয়, বরং পরস্পর পরস্পরকে নির্নয় করেছে—একটির মধ্যস্থতায় অন্যটি হয়ে উঠছে—কেউই স্বয়ম্ভু নয়। মানুষ ও প্রকৃতির এই গতিশীল সম্পর্ক বা প্রক্রিয়াকেই মার্ক্স ‘কর্তা’ জ্ঞান করলেন। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক হয়ে ওঠে পুজিতান্ত্রিক সম্পর্ক। মার্কসের কাছে ‘পুঁজি’ হচ্ছে এই সম্পর্কেরই সবচেয়ে বিকশিত ঐতিহাসিক রূপ এবং ইতিহাসের কর্তা। ইতিহাসে যখন কোন পুঁজির আবির্ভাব ঘটল, পুঁজির ইতিহাসই হয়ে উঠল মানুষের ইতিহাস। অর্থশাস্ত্র যে আসলে মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্ক বিচার এবং একদিকে জর্মান ভাবাদর্শের অভ্যন্তর থেকে প্রস্থান করার অর্থ জ্ঞানতাত্তিক পরিসরের ঐতিহাসিক সংকীর্নতা থেকে বেরিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির বিচারের বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশ।
(শেষ দুই প্যারা গৌতম দাস অনুদিত জর্মন ভাবাদর্শের ভুমিকা থেকে সংকলিত)


