আমি তখন মেডিক্যাল কলেজে ফিফথ ইয়ারের ছাত্র। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্যানেল থেকে জি এস থাকার পরে ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল থেকে ভি পি নির্বাচন করে মহাসমারোহে ছাত্রদলের কাছে হেরেছি। মন মেজাজ বিলা হয়ে আছে।
বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, এবার বিজয়ী প্যনেলের অভিষেক হবে। প্রধান অতিথি হয়ে আসলেন বি চৌধুরী স্যার, তিনি তখন বিএনপি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী। বি চৌধুরী স্যার যৌবনে রাজশাহী মেডিক্যালের শিক্ষক ছিলেন, তাই তিনি বললেন, আমি ক্লিনিক্যালের ছাত্রদের একটা ক্লাস নেব।
সন্ধ্যায় অভিষেকের অনুষ্ঠান, স্যার দিনের বেলা ক্লাস নিলেন হার্ট সাউন্ড নিয়ে। আমার জীবনে করা সেটা ছিল সেরা ক্লাস। তিনি মুখ দিয়ে এওর্টিক স্টেনোসিসের মিউজিক্যাল মারমার শোনালেন একটা অদ্ভুত হাসি মুখে নিয়ে। এরপর একে একে হলো সিস্টোলিক, লেইট সিস্টোলিক মারমার; সব কয়টা হার্ট সাউন্ডই উনি মুখে মুখে অপুর্ব কৌশলে শব্দ করে শোনালেন। আজও ভুলিনি সেই শব্দ। অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে ক্লাস শেষ করলাম। স্যার এর কথাগুলো এখনো কানে বাজে। আমি নিজেও যখন ক্লাস নেই এ আই ইউ বিতে তখন আমার কল্পনায় থাকে সেই ক্লাসটা। আমি উনার মতো করে পড়াতে চেস্টা করি। আমি অজান্তেই বি চৌধুরীর মতো একজন শিক্ষক হয়ে উঠতে চাই।
এরপর স্যারকে লাঞ্চে নিয়ে যাবেন সবাই। আমাদের শিক্ষকেরা, আমলারা, রাজনৈতিক নেতারা অপেক্ষায় আছেন। সপ্ত ব্যাঞ্জন তৈরি হয়েছে উনার আপ্যায়ণের জন্য। উনি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন সবাইকে। আমাদের দেখিয়ে বললেন, আমি ওদের সাথে খাবো। স্যার সত্যিই আমাদের হোস্টেলে এসে সবার সাথে ডাইনিং-এ বসে সেই অতি সাধারণ খাবারই তৃপ্তি নিয়ে খেলেন। এমন মানুষকে না ভালোবেসে না ভক্তি করে পারা যায়? আমি সেদিন থেকেই উনার ভক্ত।
বিএনপির দ্বিতীয় টার্মে তিনি প্রেসিডেন্ট হবার পরে একদিন বিখ্যাত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর করিম স্যার আমাকে ডাকলেন। আমি তখন অনকোলজি ক্লাবের সেক্রেটারি। করিম স্যার বললেন, বি চৌধুরী উনার ক্লাসমেট; তিনি কয়েকদিন পরে আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হসপিটাল উদ্বোধন করবেন, উনার একটা স্পিচ ড্রাফট করে দিতে হবে। আমরা কয়েকদিন খেটেখুটে স্পিচ তৈরি করলাম। বি চৌধুরী স্যার নিজেও কিছু কাটাছেঁড়া করলেন। সেদিনের স্যার এর সেই স্পিচটার যদি কোন রেকর্ড থাকে সেটা দেখলে বুঝবেন স্যার এর স্পিচটা ছিলো বাংলাদেশে উন্নত ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার একটা নিপুন পরিকল্পনা, একটা মাস্টারপিস। অবশ্য বি চৌধুরী স্যার-এর যা দেখি তাই আমার ভালো লাগে। স্যারকে নিয়ে আমার সুখস্মৃতিও কম নয়। স্যারকে যখন প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অপমান করে অপসারণ করা হল খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
আমার দেখা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বি চৌধুরী স্যার এক বর্ণিল চরিত্রের নাম। স্যার একদলীয় বাকশালের অন্ধকার সময় থেকে বহুদলীয় গনতন্ত্রে উত্তরনে যে ঐতিহাসিক ভুমিকা রেখেছেন, আমি মনে করি আজকের ফ্যাসিবিরোধি লড়াইয়েও স্যারকে সেই ভুমিকাই রাখতে হবে। এটা শুধু দেশের দুঃসময় নয়, বি চৌধুরী স্যার এর নিজে হাতে গড়া দলেরও দুঃসময়। আপনার শুধু দেশের প্রতি নয় পাশাপাশি আপনার গুন মুগ্ধ সন্তানতুল্য ছাত্র আর ভক্তদের প্রতি এবং আপনার নিজের হাতে গড়া দলের প্রতিও আপনার দায় আছে।
বি চৌধুরী স্যার আজকে যে ঐতিহাসিক ভুমিকা রাখতে পারতেন এই সময়ে তা বারেবারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মাহীর হাতে। মাহী তো বি চৌধুরী নয়। মাহীর সেই পলিটিক্যাল অতীতও নেই। মাহী চেস্টা করলেও কখনো বি চৌধুরী হতে পারবেনা। স্যার আপনি কেন শুধু মাহীর কথা শুনছেন? আমাদের মতো লাখে লাখে আপনার গুণমুগ্ধ সন্তানতুল্য ছাত্র আর ভক্তদের কাছে কি স্যার আপনার কোন দায় নেই? আপনার ছেলে বিকল্প ধারা নিয়ে থাকুক।আপনি একাই আসুন আমাদের সংগে।
স্যার, আপনি আরেকবার আমাদের হাত ধরে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান। আপনাকে পাশে পেলে ফ্যাসিবিরোধি লড়াইয়ে যে অমিত শক্তি সঞ্চারিত হবে তাকে মোকাবেলা করার শক্তি কারো নেই।
আমি জানি আমাদের ডাক আপনি উপেক্ষা করতে পারবেন না। আমরা আপনার অপেক্ষায় রইলাম।



One Response
স্বাধীন ভাবে চিন্তা করার সেই বয়স কি ওনার আছে ?