১৭৯৮ সালে ম্যালথ্যাস তার “এসে অন দ্য প্রিন্সিপেল অব পপুলেশন” বইটা প্রকাশ করেন। তিনি দেখান যে খাদ্য উৎপাদন ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে যেটাকে বলা হয় লিনিয়ার ভাবে বাড়ে কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বা এক্সপোনেনশিয়ালি। তারমানে, খাদ্যশস্যের উৎপাদন যখন গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পায় তখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে। এই তত্ত্ব অনুসারে স্বাভাবিক নিয়মে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে খাদ্যসংকট অবশ্যম্ভাবী। এই কারণে ম্যালথাস মনে করতেন যে, দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের জন্য জন্ম নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা না-গেলে দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ মারা পড়বে এবং এভাবেই জনসংখ্যা উল্লেখযেওগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
ম্যালথাসের তত্ত্ব অনুসারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দুর্ভিক্ষ হয়নি কখনো। বরং বর্তমানে খাদ্যশস্যের উৎপাদন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চাইতে বেশী। বিশ্ব এখন প্রতিটি মানুষের জন্য দৈনিক ২৭০০ ক্যালোরি খাদ্য শস্য উৎপাদন করে। একজন মানুষের জন্য গড়ে দৈনিক ২৪০০ ক্যালোরি খাদ্য লাগে। এর অর্থ হচ্ছে পৃথিবীর সব মানুষকে পর্যাপ্ত খাইয়েও কিছু খাদ্য এখন উদ্ধৃত্ত থেকে যাচ্ছে। তবে এর পরেও আজকের পৃথিবীতে পেটে ক্ষুধা নিয়েই অনেকে ঘুমাতে যায়; সেটা অবশ্য ভিন্ন আলোচনা।
ম্যালথাসের এই তত্ত্ব আবার ১৯৭২ সালে সামনে নিয়ে আসে আরেক গুরুত্বপূর্ন ইউরোপীয় থিংক ট্যাংক “ক্লাব অব রোম”। তারা বলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও একটা চরম মাত্রা আছে। তাই প্রবৃদ্ধি কখনোই একটা নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারবেনা; কারণ পৃথিবীর মানুষ কিছু সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ করে ফেলবে। যেমন তারা উদাহরণ হিসেবে বলেছিলো ফসিল ফুয়েল- এটা শেষ হয়ে যাবে। তবে ক্লাব অব রোম যেটা বিবেচনা করেনি তা হচ্ছে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদটির দাম ক্যাপিটালিজমের নিজস্ব নিয়মেই চাহিদা আর যোগানের ভারসাম্য করে বাড়িয়ে।
ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, ফসিল ফুয়েল শেষ হয়ে যায়নি এবং পৃথিবীর অর্থনীতি যত বড় হয়েছে উন্নত দেশগুলোতে ফসিল এনার্জির চাহিদা কমেছে। যেমন ইউকেতে ১৯৭০ সালে যা তেলের চাহিদা ছিল এখন চাহিদা তার চাইতে কম; যদিও জনসংখ্যা সেই সময়ের চাইতে ইউকেতে এক কোটি বেড়েছে আর অর্থনীতির আকার সেইসময়ের চাইতে দ্বিগুণ হয়েছে।
অনেকে দাবী করেন ক্যাপিটালিজম পরিবেশ ধবংস করে। প্রকৃতির বিনাশ ক্যাপিটালিজমের অবিচ্ছেদ্য ধারণা। নওমি ক্লায়েন একটা বই লিখেছিলেন, দিস চেইঞ্জেস এভ্রিথিংঃ ক্যাপিটালিজম ভার্সাস দ্য ক্লাইমেট নামে। সেখানে তিনি দাবী করেছিলেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং হচ্ছে ক্যাপিটালিজমের ফলেই আর এই জন্য গ্লোবাল ওয়ার্মিং ঠেকাতে হলে আমাদের অর্থনীতি সংক্রান্ত চিন্তার আমুল র্যাডিক্যাল পরিবর্তন আনতে হবে।
কিন্তু মজার কথা হচ্ছে, শিল্পায়নের সাথে পরিবেশ দুষনের সম্পর্ক থাকলেও, অর্থনীতি যত অগ্রসর হয় সম্পদ যত বাড়তে থাকে দূষণ ততই কমতে থাকে। শিল্পায়ানের প্রথম যুগের সময়ে পরিবেশ দুষণ যেভাবে হয়েছিল আজ আর সেভাবে হয়না।
পরিবেশের দ্রুত উন্নয়ন হবে কি হবেনা, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে পরিবেশ রক্ষিত হবে কি হবেনা এটা অর্থনীতির বিষয় নয়, পুরোটাই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
বর্তমান পৃথিবীতে বড় নগরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাজে পরিবেশ ছিলো বেইজিং এ। এর কারণ কিন্তু শিল্পায়ন ছিলোনা। এর কারণ ছিলো গাড়ীর ধোয়া, আর বেইজিং এর কাছের কয়েকটা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই বেইজিং এক বছরের মধ্যেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করে, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি সরিয়ে নিয়ে, কিছু গাড়িতে ক্যাটালাইটিক কনভার্টার লাগিয়ে বেইজিং এর এয়ার কোয়ালিটির প্রভুত উন্নতি করে ফেলেছে।অবশ্য এরজন্য বিনিয়োগ লেগেছে, আর সেটা সম্ভব হয়েছে চিনের সম্পদ থাকার ফলেই।
পরিবেশ ধবংস করার কোন প্রনোদনা ক্যাপিটালিজমের মধ্যে নেই। বরং অগ্রসর ক্যাপিটালিজমই প্রাণ আর প্রকৃতির সুরক্ষা দিতে পারে, কারণ তার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সামর্থ্য একমাত্র পুজিবাদই সৃষ্টি করে। চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে মানুষ অভিনব সমাধান বের করেই ফেলে, এটা ইতিহাসের শিক্ষা। অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য, সম্পদ সৃষ্টির জন্য প্রকৃতি আর পরিবেশকে বলি দিতেই হয়, এই ধারণা সর্বাংশে সত্য নয়।


