এটাকে ভীমের লাঠি বা পন্টি নামে ডাকা হয়। আসলে এই পন্টির সাথে কৈবর্ত রাজা ভীমের বা মহাভারতের ভীমের দূরতম সম্পর্ক নাই। এটা পাল রাজা নারায়ন পালের সময়ের তৈরি স্তম্ভ তিনি ছিলেন পাল রাজাদের সপ্তম রাজা। ৮৪৫-৯০৮ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছেন। ভাষাটা সংস্কৃত বলে দাবী করেছিলেন একজন পুরাতত্তের অধ্যাপক। ভাষাটা সংস্কৃত নয় প্রাকৃত। আর শিলালেখের পাঠোদ্ধার হয়েছে বেশ আগেই। সেই শিলালেখে লেখা ছিল নিচের কথা গুলো।
১- শান্ডিল্য বংশে (বিষ্ণু ?) তদীয় অন্বয়ে বীরদেব, তদগোত্রে পাঞ্চাল এবং পাঞ্চাল হইতে (তৎপুত্র) গর্গ জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন।
২- সেই গর্গ বৃহস্পতিকে এই বলিয়া উপহাস করিতেন যে- ( শত্রু) ইন্দ্রদেব কেবল পূর্বদিকেরই অধিপতি, দিগন্তরের অধিপতি ছিলেন না ( কিন্তু বৃহস্পতির মত মন্ত্রী থাকিতেও ) তিনি সেই একটি মাত্র দিকেও ( সদ্য) দৈত্যপতিগণ কতৃক পরাজিত হইয়াছিলেন, ( আর) আমি সেই পূর্বদিকের অধিপতি ধর্ম (নামক) নরপালকে অখিল দিকের স্বামী করিয়া দিয়াছি।
৩- নিসর্গ- নির্মল- স্নিগ্ধা চন্দ্রপত্নী কান্তিদেবীর ন্যায়, অন্তবিবর্তিনী ইচ্ছায় অনুরূপা, তাহার ইচ্ছা নাম্নী পত্নী ছিলেন।
৪- বেদচতুষ্টয়রূপ- মুখপদ্ম- লক্ষণাক্রান্ত, স্বাভাবিক উৎকৃষ্ট পদগৌরবে ত্রিলোকশ্রেষ্ঠ, কমলযোনি ব্রহ্মার ন্যায়, তাহাদের দ্বিজোত্তম পুত্র নিজের শ্রীদর্ভপাণি এই নাম গ্রহণ করিয়াছিলেন।
৫- সেই দর্ভপাণির নীতি কৌশলে শ্রীদেবপাল ( নামক) নৃপতি মতঙ্গজ- মদাভিষিক্ত
– শিলাসংহতিপূর্ণ রেবা ( নর্মদা) নদীর জনক ( উৎপত্তি স্থান বিন্ধ্য পর্বত) হইতে ( আরম্ভ করিয়া) মহেশ- ললাট- শোভি- ইন্দু- কিরণ- শ্বেতায়মান গৌরীজনক ( হিমালয়) পর্বত পর্যন্ত, সূর্যোদয়াস্ত কালে অরুণ রাগ-রঞ্জিত ( উভয়) জলরাশির আধার পূর্ব-সমুদ্র এবং পশ্চিম-সমুদ্র ( মধ্যবর্তী) সমগ্র ভূভাগ কর-প্রদ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
৬- নানা- মদমত্ত- মতঙ্গজ- মদবারি- নিষিক্ত- ধরণিতল- বিসর্পি ধূলিপটলে দিগন্তরাল সমাচ্ছন্ন করিয়া দিকচক্রাগত- ভূপাল বৃন্দের চিরসঞ্চারমানে যাহাকে নিরন্তর দুর্বিলোক করিয়া রাখিত, সেই দেবপাল (নামক) নরপাল ( উপদেশ গ্রহণের জন্য) দর্ভপাণির অপেক্ষায়, তাহার দ্বারদেশে দণ্ডায়মান থাকিতেন।
৭- সুররাজ কল্প (দেব পাল) নরপতি (সেই মন্ত্রীবরকে) অগ্রে চন্দ্রবিম্বানুকারীকে ( মহার্হ) আসন প্রদান করিয়া , নানা নরেন্দ্র- মুকুটাঙ্কিত- পাদ- পাংসু হইয়াও স্বয়ং সচকিতভাবেই সিংহাসনে উপবেশন করিতেন।
৮- অত্রি হইতে যেমন চন্দ্রের উৎপত্তি হইয়াছিল, সেইরূপ তাঁহার এবং শর্করাদেবীর পরমেশ্বর বল্লভ শ্রীমান সোমেশ্বর ( নামক) পুত্র উৎপন্ন হইয়াছিল।
৯- তিনি বিক্রমে ধনঞ্জয়ের সহিত তুলনা লাভের উপযুক্ত ( উচ্চ) স্থানে আরোহণ করিয়াও, ( বিক্রম প্রকাশের পাত্রাপাত্র- বিচার- সময়ে ধনঞ্জয়ের ন্যায়) ভ্রান্ত বা নির্দয় হইতেন না, তিনি অর্থিগণকে বিত্ত বর্ষণ করিবার সময়ে, ( তাহাদের মুখের) স্তুতি-গীতি শ্রবণের জন্য উদগর্ব হইতেন না, তিনি ঐশ্বর্যের দ্বারা বহু বন্ধুজনকে ( সংবলিগত) নৃত্যশীল করিতেন, ( বৃথা) মধুর বচন প্রয়োগেই তাঁহাদিগের মনস্তুষ্টির চেষ্টা করিতেন না ,( সুতরাং) এই সকল জগতবিসদৃশ-স্বগুণ গৌরবে তিনি সাধুজনের বিস্ময়ের উৎপাদন করিয়াছিলেন।
১০- শিব যেমন শিবার, (এবং) হরি যেমন লক্ষ্মীর পাণি গ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনিও সেইরূপ গৃহাশ্রম-প্রবেশ-কামনায় আত্মানুরূপা রল্লাদেবীকে যথাশাস্ত্র ( পত্নীরূপে ) গ্রহণ করিয়াছিলেন।
১১- তাঁহাদিগের কেদার মিশ্র নামে তপ্ত-কাঞ্চন-বর্ণাভ- কার্তিকেয়- তুল্য ( এক) পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার ( হোম কুণ্ডোত্থিত) অবক্রভাবে বিরাজিত সুপুষ্ট হোমাগ্নি-শিখাকে চুম্বন করিয়া, দিকচক্রবাল যেন সন্নিহিত হইয়া পড়িত। তাঁহার বিস্ফোরিত শক্তি দুর্দমনীয় বলিয়া পরিচিত ছিল। আত্মানুরাগ-পরিণত অশেষ বিদ্যা ( যোগ্য পাত্র পাইয়া) তাহাকে প্রতিষ্ঠা দান করিয়াছিল। তিনি স্ব-কর্মগুণে দেব-নরের হৃদয়-নন্দন হইয়াছিলেন।
১২- তিনি বাল্যকালে একবার মাত্র দর্শন করিয়াই, চতুবিদ্যা পয়োনিধি পান করিয়া, তাহা আবার উদগীর্ণ করিতে পারিতেন বলিয়া, অগস্ত্যপ্রভাবকে উপহাস করিতে পারিয়াছিলেন।
১৩- ( এই মন্ত্রবরের) বুদ্ধি-বলের উপাসনা করিয়া গৌড়স্বর ( দেবপাল দেব) উৎকল-কূল উৎকলিত করিয়া, হূণ-গর্ব খর্বীকৃত করিয়া এবং দ্রবির-গুর্জর- নাথ- দর্প- চূর্ণীকৃত করিয়া, দীর্ঘকাল পর্যন্ত সমুদ্র-মেখলা-ভরণা বসুন্ধরা উপভোগ করতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
১৪- তিনি যাচকগণকে যাচক মনে করিতেন না, মনে করিতেন তাঁহার দ্বারা অপহৃত-বিত্ত হইয়াই, তাঁহারা যাচক হইয়া পড়িয়াছে। তাঁহার আত্মা শত্রু-মিত্রে নির্বিবেক ছিল। ( কেবল) ভব-জলদি-জলে পতিত হইবার ভয় এবং লজ্জা ( ভিন্ন) অন্য উদ্বেগ ছিল না। তিনি ( সংযমাদি অভ্যাস করিয়া) বিষয় বাসনা ক্ষালিত করিয়া, পরম-ধাম-চিন্তায় আনন্দ লাভ করিতেন।
১৫- সেই বৃহস্পতি- প্রতিকৃতি ( কেদার মিশ্রের) যজ্ঞস্থলে সাক্ষাৎ ইন্দ্র তুল্য শত্রু- সংহারকারী নানা-সাগর-মেখলা-ভরণা বসুন্ধরার চির-কল্যাণকামী শ্রী শূরপাল ( নামক) নরপাল, স্বয়ং উপস্থিত হইয়া, অনেকবার শ্রদ্ধা- সলিলাপ্লুত হৃদয়ে নতশিরে পবিত্র ( শান্তি) বারি গ্রহণ করিয়াছিলেন।
১৬- তাঁহার দেবগ্রাম জাতা বব্বা ( দেবী) নাম্নী পত্নী ছিলেন। লক্ষ্মী চঞ্চল বলিয়া, এবং ( দক্ষ-দুহিতা) সতী অনপত্যা ( অপুত্রবর্তী) বলিয়া, তাহাদের সহিত ( বব্বা দেবীর) তুলনা হইতে পারে না।
১৭ – দেবকী গোপাল- প্রিয়কারক পুরুষোত্তম তনড়িয়াছে করিয়াছিলেন, যশোদা সেই লক্ষীপতিকে ( আপন পুত্ররূপে) স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। বব্বা দেবীও, সেইরূপ, গো-পাল-প্রিয়কারক পুরুষোত্তম তনয় প্রসব করিয়াছিলেন, যশো-দাতারা তাহাকে লক্ষ্মীর পতি বলিয়াই স্বীকার করে লইয়াছিলেন।
১৮- তিনি জমদগ্নিকূলোৎপন্ন সম্পন্ন-ক্ষত্র-চিন্তক ( অপর) দ্বিতীয় রামের ( পরশুরামের) ন্যায়, রাম ( অভিরাম) গুরুব মিশ্র এই আখ্যায় ( পরিচিত ছিলেন)
১৯- ( পাত্রাপাত্র- বিচার) কুশগুলবান বিজিগীষু শ্রীনারায়ণ পাল ( নরপতি) যখন তাহাকে মাননীয় মনে করতেন, তখন আর তাঁহার অন্য ( প্রশস্তি ) প্রশংসা বাক্য কি ( হইতে পারে?)।
২০- তাঁহার বাগবৈভবের কথা, আগমে ব্যুৎপত্তির কথা, নীতিতে পরম নিষ্ঠার কথা, মহতের গুণ-কীর্তনে আসক্তির কথা, জ্যোতিষে অধিকারের কথা, এবং বেদার্থ-চিন্তা-পরায়ণ অসীম-তেজসম্পন্ন তদীয় বংশের কথা, ধর্মাবতার ব্যক্ত করিয়া গিয়াছেন।
২১- সেই শ্রীভৃৎ ( ধনাঢ্য) এবং বাগধীশ ( সুপণ্ডিত) ব্যক্তিতে একত্র মিলিত হইয়া, পরস্পরের সখ্য-লাভের জন্যই, স্বাভাবিক শত্রুতা পরিত্যাগ করিয়া, লক্ষ্মী এবং সরস্বতী উভয়েই যেন ( একত্র) অবস্থিতি করিতেছেন।
২২- শাস্ত্রানুশীলন-লব্ধ-গভীর-গুণ-সংযুক্ত বাক্যে ( তর্কে) তিনি বিদ্বৎ সভায় প্রতিপক্ষের মদগর্ব চূর্ণ করিয়া দিতেন, এবং যুদ্ধক্ষেত্রেও অসীম-বিক্রম-প্রকাশে, অল্পক্ষণের মধ্যেই, শত্রুবর্গের ভটাভিমান ( যোদ্ধা বলিয়া অভিমান) বিনষ্ট করিয়া দিতেন।
২৩- যে বাক্যের ফল তৎক্ষণাৎ প্রতিভাত হইত না, তিনি সেরূপ (বৃথা) কর্ণ-সুখকর বাক্যের অবতারণা করতেন না। যেরূপ দান পাইয়া ( অভীষ্ট পূর্ণ হইল না বলিয়া) যাচককে অন্য ধনীর নিকট গমন করিতে হয়, তিনি কখনও সেরূপ ( কেলি- দানের) দান- ক্রীড়ায় অভিনয় করিতেন না।
২৪- কলিযুগ-বাল্মীকির জন্ম-সূচক, অতি রোমাঞ্চোৎপাদক, ধর্মেতিহাস-গ্রন্থ-সমূহে, সেই পুণ্যাত্মা শ্রুতির বিবৃতি ( ব্যাখ্যা) করিয়াছিলেন।
২৫- তাঁহার সুর-তরঙ্গিণীর ন্যায় অ-সিন্ধু-গামিনী প্রসন্ন-গম্ভীরা বাণী ( জগৎকে) যেমন তৃপ্তিদান করিত, সেইরূপ পবিত্র করিত।
২৬- তাঁহার বংশে ব্রহ্মা স্বয়ং পিতৃত্ব গ্রহণ করিয়া, আবার স্বয়ং পুত্ররূপে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, (ইতি) এইরূপ মনে করিয়া (লোকে) তাঁহার পূর্বপুরুষগণের এবং তাঁহার আশ্রয় গ্রহণ করিত।
২৭- তাঁহার (সুকুমার) শরীর-শোভার ন্যায় লোক-লোচনের আনন্দদায়ক, তাঁহার উচ্চান্তকরণের অতুলনীয় উচ্চতার ন্যায় উচ্চতা-যুক্ত, তাঁহার সুদৃঢ় প্রেম-বন্ধনের ন্যায় দৃঢ় সংবদ্ধ, কলি-হৃদয়-প্রোথিত-শল্যবৎ সুস্পষ্ট ( প্রতিভাত) এই স্তম্ভে, তাঁহার দ্বারা হরির প্রিয়সখা ফণিগণের (শত্রু) এই গরুড়মূর্তি ( তার্ক্ষ্য) আরোপিত হইয়াছে।
২৮- তাঁহার যশ অখিল দিগন্ত পরিভ্রমণ করিয়া, এই পৃথিবী হইতে পাতাল-মূল পর্যন্ত গমন করিয়া, (আবার) এখানে হৃতাহি- গরুড়চ্ছলে উত্থিত হইয়াছে। (এই) প্রশস্তি সূত্রধার বিষ্ণুভদ্র কতৃক উৎকীর্ণ হইয়াছে।
আমাকে এই শিলালিপির পাঠ খুজে দিয়েছেন তরুণ পুরাতত্তবিদ হাসান।
তথ্য সুত্রঃ বাংলাদেশের প্রত্ন সম্পদ
লেখাটির ফেইসবুক ভার্সন পড়তে চাইলে এইখানে ক্লিক করুন


