শ্রী চৈতন্যের অচিন্ত্যভেদাভেদ তত্ত্ব

শ্রী চৈতন্যের এই দার্শনিক তত্ত্বটার খোঁজ কোথায় পাই? এটার খোঁজে আমি এমন কেউ নাই যাকে জ্বালাইনি। অচিন্ত্য ভেদাভেদ তত্ত্ব যেহেতু নিরেট বাঙলার দার্শনিক তত্ত্ব তাই এটার খোঁজ নেয়ার বাতিক পেয়ে বসেছিল আমাকে। অনেক বই সংগ্রহ করেছি কিন্তু কোথাও অচিন্ত্যভেদাভেদবাদ পাইনি। জিদ চেপে গিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত কোলকাতার বাগবাজারের গৌড়ীয় মিশনে একটা বই পেলাম “শ্রীচৈতন্যদেব” নামে শ্রীসুন্দরানন্দ বিদ্যাবিনোদের লেখা। সেখানে একটা পুর্নাঙ্গ অধ্যায় আছে “ অচিন্ত্যভেদাভেদবাদের” উপরে। সেখানেই জানলাম এই তত্ত্ব খুজে পাওয়া যাবে শ্রী সনাতনপাদের “শ্রী বৃহদ ভাগবাতামৃতে” ও শ্রী বৈষ্ণব তোষনীতে”, তাঁর শীষ্য শ্রী রূপপাদের “শ্রী সংক্ষেপভাগবতা-মৃতে”, শ্রী জীবগোস্বামীর “ষটসন্দর্ভে” ও “সর্ব সম্বাদিনিতে”।

অচিন্ত্যানন্তশক্তিশালী পরতত্তের শক্তিসমুহ শক্তিপরিনত বস্তুসমুহের সাথে পরতত্ত্বের যে অচিন্ত্য, যুগপৎ ভেদ অভেদযুক্ত সন্মন্ধ, সেটাই অচিন্ত্যভেদাভেদবাদ। ভেদ ও অভেদের সহস্থিতি এবং উভয়েই সমভাবে সত্য ও নিত্য- কিন্তু তা অবোধ্য বা অচিন্ত্য বা চিন্তার অগম্য।

এই তত্তের সাথে আরো দুটো টার্ম যুক্ত আছে।

/ অচিন্ত্যজ্ঞানগোচর

কোন প্রমাণসিদ্ধ কাজের জন্য অন্য কোন প্রকারে উপপত্তি (সমাধান, সিদ্ধি) হয়না বলে অগত্যা যে জ্ঞান হয়ে থাকে, সেই ধরণের জ্ঞানের যা বিষয়, তাকেই অচিন্ত্যজ্ঞানগোচর বলা যায়; প্রত্যেক ভাব-বস্তুতে যে শক্তি আছে, সেটাই অচিন্ত্যজ্ঞানগোচর হয়ে থাকে; যেহেতু শক্তি মাত্রই এই ধরণের সভাব লোকসিদ্ধ। এই কারণে ব্রহ্মে যে-সকল শক্তি আছে, তা সকলেই অচিন্ত্যজ্ঞানগোচর।

/ অচিন্ত্যজ্ঞান

যে জ্ঞান কোন যুক্তি তর্কের সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা, অথচ প্রত্যক্ষ সত্য বলে যাকে স্বীকার না করেও থাকতে পারা যায়না সেটাই অচিন্ত্য- জ্ঞান। এই অচিন্ত্য- জ্ঞান কেই ভারতীয় দর্শনে অর্থাপাত্তি জ্ঞান বলা হয়েছে।

এই বুকিশ আলোচনা খুব দুর্বোধ্য। একদিন ফরহাদ মজহারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, অচিন্ত্যভেদাভেদবাদ কী? ফরহাদ ভাই বললেন, জীব এবং পরমের মধ্যে ভেদ আছে অভেদ ও আছে। পরম যদি কর্তা (পুরুষ) হয় তবে তাঁর মধ্যে আপনি যেমন আছেন, তাঁর বাইরেও আছেন। আপনি যখন চিন্তা করেন তখন তাঁর বাইরে চলে যান আর যখন চিন্তা করেন না, তখন তাঁর মধ্যে থাকেন। কিন্তু উভয়ের সম্পর্কটা কেমন? আমরা এই সম্পর্ককে কী করে ব্যাখ্যা করবো রূপ গোস্বামী এটাকে বলছেন “অচিন্ত্য” বা চিন্তার দ্বারা বুঝা যাবেনা, এটাকে ভক্তি দিয়ে বুঝতে হবে। চিন্তার অগম্য সেই অর্থে অচিন্ত্য। লালন এই ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেননি। লালন সম্পর্ককে চিন্তার অগম্য মনে করেন কিন্তু এই সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেন একত্ববাদের জায়গায় দাড়িয়ে। আপনি যদি ভেদ এবং অভেদ কে এসেনশিয়ালাইজ করেন তবে একত্ব বাদ থাকেনা। লালন মনে করে ভেদটা মায়া, মায়া দিয়ে আক্রান্ত হয়ে আপনি ভাবেন জগত টা আপনার বাইরে এবং জগত আপনার জ্ঞানের বিষয়। তখন জ্ঞানের কর্তা হিসেবে জ্ঞান ও বিষয় আলাদা হয়ে যায়। লালন বলেন না সেটা নয়, আপনি কখনোই আলাদা নন, এই সম্পর্কটা বিরহের সম্পর্ক। সে আর লালন একসাথে রয়, তবু লক্ষ যোজন ফাঁকরে । গায়েবের ব্যাখ্যা লালনের এই অবস্থান বুঝার জন্য কাজে লাগে।

 

Share

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Feeling social? comment with facebook here!

Subscribe to
Newsletter