আমার সিপিবি ওরিয়েন্টেশনে সোহরাওয়ার্দীকে একজন খারাপ রাজনীতিবিদ হিসেবে জেনে এসেছি। সিপিবিতে গ্রেইট ক্যালকাটা কিলিং এর জন্য সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করা হয়। কখনো যাচাই করে দেখিনি যা বলা হচ্ছে সেটা আসলেই সত্য কিনা। নেতারা যা বলেন তা বেদবাক্য হিসেবে মেনে নেয়াই গুড সিপিবি হওয়ার লক্ষণ।
সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে আমার প্রথম ভুল ভাঙ্গে “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” পড়ে তারপরে “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” পড়ে শেষে ন্যাপের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদের “সময়ের কন্ঠস্বর” আমাকে একটা পুর্নাংগ ধারণা দিয়েছে।
আমার এখনকার মুল্যায়নে শহীদ সোহরাওয়ার্দী এক গরীব দরদি, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতা, যিনি প্রবলভাবে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। তিনি যখন সুযোগ পেয়েছেন তখনই লেফট বা লেফট ঘেষাদের পুর্ন সমর্থন দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
তিনি গরীব দরদি হয়ে ফিরে এসেছিলেন ইংল্যান্ডে যাওয়ার পরে। সেইসময়ে ইংল্যান্ডে যারা যেত ইংল্যান্ডের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের সাথে যোগাযোগ করতো এবং মার্ক্সবাদে দীক্ষা দিতে চেষ্টা করতো। দেশে ফিরে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দিলেও খিদিরপুরে ডক শ্রমিকদের সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। এই সংগঠন পরে কমিউনিস্টেরা দখল করে নেয় কিন্তু এটা ছিল সোহরাওয়ার্দির শ্রমে গড়া। তবে কমিউনিস্টদের মতো লাল ঝাণ্ডা সংগঠন নয়, এটা ছিল সবুজ ঝান্ডা সংগঠন। এই সংগঠনের শ্রমিকেরা কমিউনিস্টদের লাল ঝাণ্ডার বদলে সবুজ ঝাণ্ডা ব্যবহার করতো।
তিনি মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের সাথে মিলে “রায়ত-খাতক” সমিতি গড়ে তুলেছিলেন। সোহোরাওয়ার্দী সভাপতি আর তর্কবাগীশ সাধারণ সম্পাদক। এই সমিতিওর লক্ষ্য ছিল “রায়ত” অর্থাৎ কৃষক প্রজাদের উপরে জমিদারের অত্যাচার বন্ধ করা আর “খাতক” অর্থাৎ ঋণ গ্রহীতার উপরে মহাজনের অত্যাচার বন্ধ করা।
সোহরাওয়ার্দী সাহেব বাঙলা বলতে পারতেন না। পরে তিনি পুর্ববঙ্গের ভাষা শিখেছিলেন। যদিও প্রথম দিকে তাঁর অদ্ভুত ভাষার বাঙলা বক্তৃতা হাস্যরসের উদ্রেক ঘটাতো। একবার তিনি কলকাতার মুসলিম ইন্সটিটিউটে বক্তৃতা দিচ্ছেন। তিনি লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যানের বাঙলা করে বক্তৃতা শুরু করবেন। তিনি বললেন, “ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মাগীগণ”।
যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন হবে। যুক্ত্রফ্রন্টের অন্যতম শরিক নেজামে ইসলাম পার্টির মওলানা আতাহার আলী ১২ জনের তালিকা দিয়ে বলেন এরা বর্ণচোরা কমিউনিস্ট এদের মনোনয়ন দেয়া যাবেনা। আবার এই বারোজন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। বলাই বাহুল্য নেজামে ইসলাম পার্টির অভিযোগ মিথ্যা ছিলনা। তাঁরা সকলেই গোপনে পার্টির সদস্য ছিলেন এবং এটা সোহরাওয়ার্দী খুব ভালোভাবেই জানতেন। এই ১২ জনের মধ্যে ছিলেন আমাদের প্রিয় Shafiur Rahman লিটুর আব্বা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় আতাউর রহমান (আতাউর চাচা)।
সোহরাওয়ার্দী এগিয়ে এলেন উদ্ধার করতে, তিনি বললেন, আমি বিলাতে কমিউনিস্ট দেখেছি, আমি কমিউনিস্ট চিনি, কমিউনিজম বুঝি। এ মুসলিম ক্যান নেভার বি এ কমিউনিস্ট (একজন মুসলমান কখনো কমিউনিস্ট হতে পারেনা), এট মোস্ট দে ক্যান বি কল্ড লালমিয়া (তাঁরা বড় জোর লালমিয়া হতে পারে, যারা মুখেই কেবল কমিউনিস্ট বুলি আওড়ায়)।
যাই হোক শেষ পর্যন্ত মওলানা আতাহার আলীর তালিকা ১২ থেকে কমে একজন হল। তিনি হাজি দানেশকে কিছুতেই নমিনেশন দেবেন না। সোহরাওয়ার্দী আর আতাহার আলী নমিনেশন বোর্ডে বসেছেন। হাজী দানেশ ঢুকবেন। আগেই সোহরাওয়ার্দী তাঁর প্রিয় শিষ্য শেখ মুজিবকে বলে দিয়েছেন হাজী দানেশকে যেন ভালো করে ব্রিফ করে দেয়া হয়।
হাজী দানেশ ঢুকলেন রুমে, টুপি দাঁড়ি নিয়ে, ঢুকেই লম্বা করে বলে উঠলেন, “আচ্ছালামু আলাইকুম”। সোহরাওয়ার্দি বলে উঠলেন, দেখেন মওলানা সাহেব, কমিউনিস্টদের মুখে দাড়ি আর মাথায় টুপি থাকে? ওরা কখনো, “আচ্ছালামু আলাইকুম” বলে? ওরা বলে “লাল সালাম”।
মওলানা আতাহার সাহেব মাথা নাড়েন, তিনি বলেন, না স্যার, আপনি জানেন না, সে পাক্কা কমিউনিস্ট আমার কাছে খবর আছে। সোহরাওয়ার্দী বলেন, আরে দেখেন তাঁর দাঁড়ি আছে টুপি আছে। মওলানা সাহেব ছাড়বেন কেন? তিনিও বলেন, মার্ক্স-লেনিনেরও টুপি দাঁড়ি দুটাই ছিল স্যার, আপনি তো জানেন।
এবার বিরস বদনে সোহরাওয়ার্দী প্রশ্ন করলেন,। হাজী সাহেব, নমিনেশন দিলে পাশ করবেন তো? হাজী সাহেব ঘর কাপিয়ে উত্তর দিলেন, ইনশাল্লাহ স্যার পাশ করবো। এইবার সোহরাওয়ার্দী লাফিয়ে উঠলেন, এই দেখেন মওলানা সাহেব, একজন কমিউনিস্ট কখনো আল্লাহ বলতে পারেনা। কমিউনিস্ট আল্লাহ বললে সে কমিউনিস্ট থাকেনা। যান, হাজী সাহেব আপনাকে নমিনেশন দেয়া হল।
লেখাটির ফেইসবুক ভার্সন পড়তে চাইলে এইখানে ক্লিক করুন
তথ্যসুত্রঃ সময়ের কন্ঠস্বর, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, আলোঘর প্রকাশনা, আগস্ট ২০১৭; পৃষ্ঠা ৫৫-৫৮


