রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “দেবতারে প্রিয় করি– প্রিয়রে দেবতা”। হিন্দুদের বেদ ও পুরানে যেই দেব চরিত্র গুলো আছে সে সব দেব চরিত্রই আসলে মানব চরিত্র। সেই সব দেবতাদের মানুষের মতো রাগ, ভয়, ক্রোধ, কাম, লোভ আছে। শুধু তাই নয় রোগ আছে, মৃত্যু আছে। তাঁরা অজর অমর নন। সাংখ্য মতে জরা কিংবা বিনাশ দেবভুমিতেও একই রকম। পুরানের শ্লোক সংগ্রহ যুক্তিদীপিকা বলছে- পুণ্যবল ক্ষীণ হলে স্বর্গ থেকে দেবতাকে মরনান্তক বিদায় নিতে হয়।
দেবতাদের রোগ ভোগও আছে। যুক্তিদীপিকার দার্শনিক বেদ থেকে নথি তুলে দেখিয়েছেন দেব্রাজ ইন্দ্রের একবার ইনসমনিয়া হয়েছিল। সারা রাত তাঁর ঘুম হয়না, বিছানায় ওঠেন আর বসেন। স্বর্গ উনার জন্য একেবারে নরকবাস হয়ে উঠেছিল। এই রোগের চিকিৎসা দিয়েছিলেন ঋষিরা। অদ্ভুত সেই চিকিৎসা। ঘুমের সময় সাম গান শোনা। ব্যাস ইন্দ্রের রোগ ভালো হয়ে গেল।
সাংখ্য দার্শনিক প্রজাপতি ব্রহ্মার রোগও উল্লেখ করেছেন। বিশাল জগত সৃষ্টির পরিশ্রমে নাকি উনার বায়ু রোগ হয়েছিল। আমরা মানসিক রোগকে বলি মাথার বায়ু চড়া, সেটাই কী?
এবার চন্দ্রদেব। উনার কাহিনীটা মজার। দক্ষ-প্রজাপতির সাতাশটি মেয়ে ছিল, এমন সুপাত্র দেখে সাতাশটি মেয়েরই বিয়ে দিলেন চন্দ্রের সঙ্গে। অশ্বিনী, ভরণী, কৃত্তিকা, রোহিণী, মৃগশিরা, আদ্রা এমন সাতাশটি নক্ষত্রের স্বামী হলেও শুধু রোহিণীকে নিয়ে থাকেন চন্দ্র। অন্য বোনেরা রেগে বাপের কাছে নালিশ দিলো। দক্ষ-প্রজাপতি চন্দ্রকে ডেকে বুঝিয়ে শুনিয়ে দিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। যা চলছিল তাই চলল। রোহিণী ছাড়া চন্দ্রের আর কোন কথা নেই। এবার রেগে দক্ষ অভিশাপ দিলেন চন্দ্রকে, যে চন্দ্রের যক্ষ্মা হবে। সেই যক্ষ্মা এখনো ভালো হয়নি, তবে রেমিশন আছে। আমাবস্যা থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত চলে রেমিশন তখন গায়ে গতরে বাড়ে চন্দ্র। কিন্তু পূর্ণিমার পর থেকেই শরীরে আসে ক্ষয়। সেই সময় মনে করা হতো অতিরিক্ত শুক্র ক্ষয় থেকে ক্ষয় রোগ বা যক্ষ্মা হয়।
অগ্নির অজীর্ণ রোগ হয়েছিল যজ্ঞের ঘি খেতে খেতে। প্রজাপতি ব্রহ্মা নিদান দিয়েছিলেন খান্ডব বোনের কিছু গুল্ম পুড়িয়ে খেতে। এই কাজ অগ্নি করিয়ে নিয়েছিলেন অর্জুনকে দিয়ে। অর্জুন খান্ডবদাহন করেছিল আর তার সাথেই খাণ্ডব বনে বাস করা তক্ষক কুলকে নির্বংশ করেছিল।
দেবতাদের মরণও আছে। বৌদ্ধ দার্শনিক আচার্য বসুবন্ধুর অভিধর্মকোষে লিখেছেন-মরার আগে দেবতাদের পাঁচ ধরণের উপসর্গ দেখা দেয়। তাদের বস্ত্র আর অলঙ্কারের মাঝখান থেকে মিষ্টি একটা শব্দ বেরুতে থাকে। শরীরের তেজ একেবারে স্তিমিত হয়ে যায়। স্নান করলে শরীরের জল শুকায় না। স্বাভাবিক অবস্থায় দেবতাদের চোখের পাতার নাকি পলক পরেনা, কিন্তু মরণকাল উপস্থিত হলে চোখের পলক পরে।
আচার্য বসুবন্ধু অবশ্য দেবতাদের মরণকে “মরন” শব্দে বিধৃত করেননি। তিনি বলেছেন “চ্যবনধর্মণো দেবপুত্রস্য” অর্থাৎ স্বর্গ থেকে যাদের চ্যুতি বা বিদায় হচ্ছে।
দেবতারে প্রিয় করি– প্রিয়রে দেবতা, নিজেকেই নিজে মানুষ দেবতা বানায়, সেই দেবতার ভজনা করে মানুষ পরমকে পাবার বাসনায়। দেবতা আর কেউ নয়, সে মানুষই, তাই সে মানুষের প্রিয়, তাই সে মানুষের সখা।
তথ্যসূত্রঃ
১/ সাংখ্য কারিকা ৫৫
২/ মৎস্য পুরানম ২৩। ১০
৩/ বসুবন্ধু অভিধর্মকোষ পৃষ্ঠা ৫০৫


