“চণ্ডী” মানে দজ্জাল মহিলা নন

সংস্কৃতে “চণ্ড” শব্দটা কোপন স্বভাব বুঝায় তাই “চণ্ডী” শব্দটাকে চণ্ডের স্ত্রী লিঙ্গ ধরে নিয়ে দজ্জাল এবং রাগী মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত করা হয়। এই ভুলটার উৎপত্তি কোবার্ন বলে এক সাদা চামড়ার সাহেব থেকে। দেবীমাহাত্ম্যম্ গ্রন্থে “চণ্ডী” বা “চণ্ডিকা” সর্বোচ্চ দেবী। কোবার্নের মতে, চণ্ডিকা হলেন ভয়ংকরী ও ক্রোধন্মত্তা দেবী। উল্লেখ্য, প্রাচীণ সংস্কৃতে “চণ্ডিকা” শব্দটি কোথাও পাওয়া যায় না। বৈদিক সাহিত্যেও এই শব্দটির কোনো উল্লেখ নেই। কোবার্ন এই শব্দটার অর্থ কোথায় পেলেন? এটা নিয়ে অধ্যাপক শ্রী কালিদাস ভট্টাচার্যের সাথে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুরীর একটা চমৎকার আলাপ আছে। আলাপটা পড়ে দেখতে পারেন নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুরীর দেবতার মানবায়ন বইয়ে। আলাপটা সেখান থেকেই ধার করা।

প্রথমত “চন্ডী” কোন রাগী মহিলার নাম হলে মায়ের নাম চণ্ডী হতো না। এছাড়াও মেঘদুতের উত্তরকল্পে যক্ষ যখন প্রিয়ঙ্গুলতায় আপন প্রিয়ার শরীর অনুভব করছেন, হরিনের চকিত চাহনিতে প্রিয়ার কটাক্ষ দেখছেন কিংবা চাঁদের মধ্যে প্রিয় মুখের ছায়া দেখছেন, তখন যক্ষ সেই প্রিয়াকে সন্মোধন করে “চণ্ডী” বলে।

হন্তৈকস্মিন ক্কচিদপি তে চণ্ডী সাদৃশ্যমস্তি

মানে; চণ্ডী আমার, সব জায়গায় একটু একটু করে তোমাকে অনুভব করছি বটে, কিন্তু এক জায়গায় পুরোটা পাচ্ছিনা কোথাও।

বিরহ কাতর যক্ষ প্রিয়াকে “চণ্ডী” বলে সন্মোধন করলো, এখানে রাগারাগির কোন বিষয় নেই দজ্জাল গিরির তো নেই ই। চণ্ডী এখানে পরম প্রেমাস্পদ।

অধ্যাপক কালিদার ভট্টাচার্যের মতে এটা ভাষার চলনের একটা বিরল ঘটনা। এটা সংস্কৃতের উপর প্রাকৃত ভাষার প্রভাব। সেটা কীভাবে? কখনো কখনো কোন শব্দ ভিন্ন ভাষায় আত্তীকৃত হয়ে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে আবার সেই পুরনো ভাষায় ফিরে আসে। “চণ্ডী” শব্দটার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সেকারণেই চণ্ডী শব্দটার প্রাচীণ সংস্কৃতে এবং বৈদিক সাহিত্যে কোনো উল্লেখ নেই।

এই ক্ষেত্রেও মুল সংস্কৃত থেকে একটা শব্দ প্রাকৃতে গিয়ে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে আবার সংস্কৃতে ফিরে এসেছে। মুলে সংস্কৃত শব্দটা ছিল “চন্দ্রী” এর অর্থ চাঁদের আলো বা জ্যোৎস্না। এইখান থেকেই আমাদের চন্দ্রিমা উদ্যান নামটা এসেছে। “চন্দ্রী” শব্দটা প্রাকৃতে হয় “চণ্ডী”, প্রাকৃতে চণ্ডী শব্দের অর্থ জ্যোৎস্না। এই প্রাকৃতের চণ্ডীই ফিরে এসেছে সংস্কৃতে চণ্ডী নাম নিয়ে।

তাহলে শেষে দাঁড়ালো চণ্ডী অর্থ জ্যোৎস্না। কোবার্নের মতে, ভয়ংকরী ও ক্রোধন্মত্তা নন। চাঁদের আলোয় স্নাত রমণী অথবা চাঁদের মতো স্নিগ্ধ রমণীই “চণ্ডী”। তাহলেই দুর্গার আরেক নাম হিসেনে “চণ্ডী’। কালিদাসের মেঘদুতের বিরহকাতর যক্ষের প্রিয়তমাকে “চণ্ডী” নামে ডাকাও সার্থক।

 

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Feeling social? comment with facebook here!

Subscribe to
Newsletter