দুটো নতুন কথা খুব শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।
-হুমায়ুন আহমেদ বাংলাসাহিত্যের বিপুল পাঠক তৈরি করেছেন।
-হুমায়ুন আহমেদের পাঠকেরা উন্নততর সাহিত্যপাঠের আকাঙ্খার চেতনায় বিবর্তিত হতে পারেননি।
এর মধ্যে হয়তো সত্য আছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সত্য কী আছে? বোধহয় না। অনেকেই আছেন অন্য সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি হুমায়ুন আহমেদ পড়েন। আবার এমন পাঠক হয়তো আছেন যারা হুমায়ুন আহমেদ ছাড়া আর কারো রচনা পড়েননা। অনেকে বলেন এই পাঠককুলের সংখ্যা আমরা শুধু অনুমান করতে পারি, নিশ্চিতভাবে বলতে পারিনা যে এই পাঠককুল কত বড়? তবে হুমায়ুন আহমেদের বই এর সংস্করন এবং প্রকাশ সংখ্যার কথা যেটুকু শুনতে পাওয়া যায় এর সাথে আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মিশেল দিয়ে বলা যেতে পারে এক ঈর্ষনীয় সংখ্যক পাঠক ছিলেন যারা হুমায়ুন আহমেদের নিজস্ব বা একান্ত পাঠক, যারা শুধুমাত্র হুমায়ুন আহমেদই পড়েন অন্য কিছুনা। এমন একান্ত পাঠক হুমায়ুন আহমেদের নিজস্ব সম্পদ। লেখক হুমায়ুন আহমেদের সার্থকতা বা ব্যর্থতা বিচার করতে আমাদের মূল্যায়ন করা উচিৎ এই একান্ত পাঠকদের নিয়ে।
একজন পাঠক যখন যখন কিছু পাঠ করেন তখন সেটা থেকে কিছু অর্জন করতে চায়। একজন পাঠক “পাঠ” থেকে কী অর্জন করতে পারে বা কেন একজন কিছু পাঠ করে?
-অভ্যাস
– সময় কাটানোর জন্য
– সমসাময়িক ঘটনাবলী জানা বা বোঝার জন্য।
– তাৎক্ষনিক সন্তুষ্টি বা মূল্য বোধের জন্য
-জীবনের বাস্তব চাহিদা পুরনের জন্য
– জীবিকার স্বার্থে
– সামাজিক এবং নাগরিক জীবনে উত্তম নাগরিকের কর্ম সম্পাদনের জন্য
– আত্মিক চাহিদা মেটান এবং আত্মবিকাশের জন্য।
– বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা মেটানর জন্য।
এই কারণগুলির কিছু ব্যাক্তিগত এবং নিজস্ব, আর কতগুলি হচ্ছে সমাজগত কারন। এই দুইএর মধ্যে নানা ব্যাঞ্জনার আন্ত সম্পর্ক থাকতে পারে। কেউ যখন একটা কবিতা পড়ে তখন তার কারণ হয়তো ব্যাক্তিগত, কিন্তু সে যদি একজন কবি হয় তাহলে কবিমহলে তার অবস্থানের বিষয়টি বা তার কবিতাকে আরও তীক্ষ্ণ করার প্রয়োজনীয়তাও নতুন একটা কবিতা পড়ার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। আত্মিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা মেটাতে পারলেই আমরা তাঁকে সু সাহিত্য বলি।
পাঠ একটি নিঃসঙ্গ প্রক্রিয়া। লেখকের ভাবের সাথে একান্তভাবে পাঠকের মস্তিস্কের ক্রিয়া হয়। নিঃসঙ্গ পাঠের পরবর্তী স্তর হচ্ছে, পাঠের মাধ্যমে সংগৃহীত ভাবের ফলপ্রসূ আদান প্রদান। এই আদানপ্রদান না হলে পাঠক অনিবার্যভাবে তার পঠিত বিষয়ের উপভোগ এবং ব্যাবহারে একজন নিঃসঙ্গ পাঠকে পর্যবসিত হবে। এবং এমন হলে অন্যের সঙ্গে আলোচনা, দ্বন্দ্ব, মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জনের ফল লাভে পাঠক এবং সমাজ দুইই বঞ্চিত হয়। নিঃসঙ্গ পাঠকের পাঠ তাই শুধু সময় কাটানোর আনন্দে পর্যবসিত হয়। তখন বই পড়ে সময় হয়তো কাটে কিন্তু এর ফলে না লাভ হয় ব্যাক্তির, না লাভ হয় সমাজের। শুধু সময় ক্ষেপণের জন্য পাঠে আত্মিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা পুরন হয়না।
হুমায়ুন আহমেদের রচনায় এমন সব বিষয় থাকে যেটাতে অনবদ্য স্টোরি টেলিং এর কারণে সময় খুব ভালো কেটে যায়, কিন্তু অন্যের সাথে মিথস্ক্রিয়ার কোন তাগিদ পাঠক অনুভব করেননা; পাঠের পরবর্তী স্তরে পাঠকের উত্তরন ঘটেনা। তাই তাঁর একান্ত পাঠকেরা তার সৃষ্ট চরিত্র “হিমু”র মতোই নিঃসঙ্গ পাঠক।


