হিন্দু ধর্মের সৃষ্টি বহু সংস্কৃতির সমাহারে। হিন্দু ধর্মকে অনেক উপধর্ম আর স্থানীয় সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করতে হয়েছে, সেটার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে হিন্দু ধর্মের লোকাচার ও উৎসবের মধ্যে। যেই সময়ে একটি লোকাচার হিন্দু ধর্মে প্রবেশ করেছিল ঠিক সেই সময়ে তার তাৎপর্য কী ছিল সেটা আবিস্কার করাটা এখন দুরূহ। কারণ কয়েক হাজার বছরে সেই মুল আচারের তাৎপর্য পাল্টিয়ে এখন সেটা নিছক প্রতীকী অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। হিন্দু ধর্মে যেমন আছে বৈদিক যাগ যজ্ঞের আচার তেমনি আছে আদিম উপজাতিদের বিগ্রহ পুজাও। হিন্দু ধর্মের আচার ও উৎসবের সেই কারণেই এলাকা ভেদে তফাৎ আছে। বাঙালি হিন্দুর কাছে দুর্গা পুজা যেই মাপের উৎসব মহারাষ্ট্রের হিন্দুর কাছে গনেশ পুজা সেই মাপের উৎসব। হিন্দু ধর্ম যেহেতু ঈশ্বর প্রাপ্তির নানান পথের কথা আছে তাই প্রত্যেকের জন্য কোন বিশেষ ধর্মাচারণ আবশ্যিক নয়।
দৈনন্দিন আচার
সকাল আর সন্ধ্যায় পুজা যার মধ্যে আছে সকালে সূর্য প্রণাম আর সন্ধ্যারতি।

সূর্য প্রণাম
এগুলো সধারনত নিজের ঘরেই সম্পন্ন হয়। কোন কোন হিন্দু বাড়িতে আলাদা ঠাকুর ঘর থাকে সেই ঠাকুর ঘরে বাড়ির মহিলারাই মুলত পুজা আর্চনা করে থাকেন।

সন্ধ্যারতি
হিন্দু মন্দিরে প্রতিদিনই পুজা হয়। সেই পুজার দায়িত্ব থাকে মন্দিরের নিযুক্ত পুরোহিতের। মন্দিরে কেউ চাইলে নিয়মিত যেতে পারে। তবে অধিকাংশ হিন্দুই বিশেষ দিন বা কারণ ছাড়া মন্দির মুখো হয়না।
সাপ্তাহিক আচার
কেউ কেউ সপ্তাহের কোন একদিন উপবাস করেন। উপবাস প্রকৃতি ভেদে নিরম্বু (জলপান হীন) হতে পারে। এমন উপবাস ও আছে যেখানে জলপান করা যায়। পুজায় অঞ্জলি দেয়া, বিয়ের পাত্র পাত্রিকে সূর্যোদয় থেকে এমন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার আগে পর্যন্ত উপবাস করতে হয়। পূর্ণিমা আমাবস্যায় তিথি পালন বা প্রায়শ্চিত্ত করেন কেউ কেউ। যেমন “ব্রত” পালন এক ধরণের তিথি পালন।

ব্রত পালন
এই ব্রত পালনের সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম নাই কিন্তু পরিবারের মেয়েরা এই ব্রত পালন করে পরিবারের মঙ্গল কামনায়। ব্রতর নিয়ম গুলি পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে নির্ধারিত হয়। সাবিত্রিব্রত করা হয় স্বামীর মঙ্গল কামনায়, ষষ্ঠী ব্রত সন্তানের মঙ্গল কামনায়, মাঘ মণ্ডলের ব্রত শীতের দিনে উজ্জ্বল রোদের কামনায়, পৌষ ব্রত ভালো শস্যের কামনায়।
বাৎসরিক উৎসব
এই বাৎসরিক উৎসবই হচ্ছে হিন্দু দেব দেবীর পুজা ও ধর্মীয় কাজের বড় উপলক্ষ। এর মধ্যে আছে লক্ষ্মী পুজা ( ঐশ্বর্য আর সৌন্দর্যের দেবী), সরস্বতী পুজা ( বিদ্যার দেবী), কার্ত্তিক (বীরত্বের দেবতা), গনেশ (জ্ঞান আর সিদ্ধির দেবতা), মনসা (সাপের দেবী)। মনসা দেবী পূর্ববঙ্গের অনার্য দেবী যা হিন্দু ধর্মে আত্তীকৃত হয়েছে। আর আছে দেবী পুজা ( বিশ্বমাতার নানা রূপ যেমন কালি, দুর্গা ইত্যাদি)।
কিছু উৎসব পৌরাণিক ঘটনাকে ঘিরে যেমন অবতার কৃষ্ণের জন্মে জন্মাষ্টমী।

ভাইফোঁটা
কিছু উৎসব আছে আত্মীয় স্বজনের মঙ্গল কামনায় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাতৃ দ্বিতীয়া বা সহজ বাঙলায় ভাইফোঁটা, যেখানে বোন ভাইয়ের কপালে টিপ দিয়ে ছড়া বলে “ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা যম দুয়ারে পড়লো কাঁটা।
এই ভাই ফোঁটা সকল হিন্দু পুরুষের এক অদ্বিতীয় আনন্দের অনুভুতি।
সমাজের আর্থিক জীবনের সাথে জড়িত উৎসব
এমন দুটো উৎসবের নাম করা যেতে পারে। একটা নবান্ন উৎসব যখন নতুন চাল ঘরে ওঠে আর বিশ্বকর্মার পুজা যেটা করেন চারু আর কারু শিল্পিরা। তাঁদের কাজের জন্ত্রপাতি বিশ্বকর্মার বেদীতে রেখে পুজা দেন যেন আরো সুনিপুন কাজ তাঁরা ভবিষ্যতে করতে পারেন।
ঋতু সংক্রান্ত উৎসব

হোলি বা বসন্ত উৎসব
হোলি বা বসন্ত উৎসব, যেখানে আবীর আর রঙ নিয়ে পরস্পরকে রাঙ্গিয়ে দেয়া হয়। বসন্তে প্রকৃতি যেই বর্ণময় সাজ নেয় প্রকৃতির অংশ হিসেবে মানুষ ও নিজেকে সেই রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিয়ে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যায়। তাৎপর্যের দিক থেকে এই হোলি উৎসবের আমার কাছে এক অনন্য রাজনৈতিক মূল্য আছে।
জীবনের নানা সময়ের সাথে যুক্ত উৎসব

উপনয়ন বা উপবীত ধারণ
সকল ধর্মের মতো শিশুর নামকরণের উৎসব আছে এছাড়া অন্নপ্রাশন বলে একটা উৎসব আছে যখন শিশুকে প্রথম শক্ত খাবার দেয়া হয়। এছাড়া ব্রাম্মন সন্তানদের জন্য আছে উপনয়ন বা উপবীত ধারণের অনুষ্ঠান। ব্রাম্মন সন্তান তার অধিকার আর করনীয় নিয়ে ব্রাম্মন সমাজে প্রবেশ করে। উপবীত নতুন জন্মের প্রতীক তাই উপবিতধারিকে বলা হয় “দ্বিজ” মানে যার দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে ব্রাম্মন সন্তান হলেও “দ্বিজ” নই। আমার প্রথম জন্মের ভারেই আমি ন্যুব্জ।
এছাড়া আর দুটো গুরুত্বপূর্ণ লাইফ ইভেন্ট আছে একটা বিবাহ আর শ্রাদ্ধ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। শ্রাদ্ধ শব্দের অর্থ শ্রদ্ধা নিবেদন।
একজন হিন্দুকে সবগুলো আচার পালন করতে হলে তাঁকে আর কিছু করতে সময় পেতে হতোনা। সবাই মাত্র কয়েকটি করে। আবার কেউ কেউ তেমন কিছুই করেনা। এই স্বাধীনতা অনর্থক নয়, এই স্বাধীনতার কারণ ও আছে, তবে সেটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়।
হিন্দু ধর্মে প্রতিমা বা মূর্তির ব্যবহার এবং একইসাথে একেশ্বর বাদ বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। হিন্দু ধর্মের দর্শনে সর্বব্যাপী, সর্ব স্পর্শী, সর্বত্র বিরাজমান ঈশ্বরে বিশ্বাস আর হিন্দু দেবলোকের বিচিত্র দেবদেবীর পুজা এই দুইয়ে কোন বিরোধ নেই। ধর্মীয় উৎসবে দেবতার প্রতিমা ভক্তিকে একাগ্র হতে সাহায্য করে কিন্তু তত্ত্বগত ভাবে তাঁরা এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরের কাল্পনিক ছবির বেশী কিছু নয়। পুজা প্রতিমা ছাড়াও হয়, একটি জলপূর্ণ ঘট সামনে রেখেও হিন্দুদের যে কোন পুজা সম্পন্ন করা সম্ভব।

ঘট পুজা
ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ের বারানসির পণ্ডিতদের হিন্দু ধর্মের আচার সর্বস্বতা আর প্রতিমা পুজা দেখে মর্মাহত হয়েছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, আপনারা এসব সহ্য করেন কী করে?
পণ্ডিতেরা উত্তর দিয়েছিলেন,
“ সত্যি আমাদের মন্দিরে মন্দিরে নানা প্রতিমা আছে। এইসব প্রতিমার প্রতি আমরা প্রভূত ভক্তি নিবেদন করি আভুমি প্রণত হয়ে, সাড়ম্বরে ফুল, তণ্ডুল, সুগন্ধি তেল, চন্দন ওই রকম নানা সামগ্রী দিয়ে। তবু এই প্রতিমাগুলিই ব্রম্মা বা বিষ্ণু এমন বিশ্বাস আমাদের নেই। এগুলি শুধুই তার প্রতিরুপ মাত্র। আমরা শ্রদ্ধা নিবেদন করি শুধু এই কারণে যে, তাঁরা আমাদের উপাস্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। আমরা প্রার্থনা জানাই প্রতিমাকে নয় দেবতাকে। আমাদের মন্দিরে প্রতিমা রাখা হয়ে থাকে কারণ মনে হয় চোখের সামনে কিছু থাকলে ভক্তির একাগ্রতা বাড়ে পুজা নিবেদনে; কিন্তু আসলে আমরা স্বীকার করি যে ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, তিনিই সর্বশক্তিমান বিধাতা।”
হিন্দুদের আচার অনুষ্ঠানের তাৎপর্য বুঝার জন্য কল্পনাশক্তির প্রয়োজন। এই কল্পনাশক্তি হিন্দু ধর্ম পালনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ যদি মনে করেন পুজা দিতে আসা একজন হিন্দু সত্যিই মনে করেন, স্বর্গে সরস্বতী নামে এক সুন্দরি তরুণী হাসের উপর বসে বীণা বাজাচ্ছেন, তবে বিষয়টা আসলেই হাস্যকর হয়ে যায়। বিমূর্ত ভাবনাকে প্রতীকী মূর্তিতে ধরা ভারতীয় সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ। কালিদাসে মেঘদুতের রস আস্বাদন করতে হলে বিরহী প্রেমিকের বার্তা কীভাবে মেঘ নিয়ে যায় সেই রহস্যের আর চিত্রকল্পের জাল ছিঁড়তে হবে।

মেঘের কাছে বিরহীর বার্তা পাঠানো
ঈশোপনিষদে ঈশ্বরকে বলা হয়েছে “কবি”। কবি যেমন রহস্যের জাল বুনতে বুনতে যান আর পাঠক সেই জাল কল্পনায় খুলতে খুলতে কবিতার রস আস্বাদন করেন তেমনি হিন্দু ধর্মের পরতে পরতে আছে রহস্যের জাল যার ভাজ কল্পনা দিয়ে খুলেই ভক্তকে ধর্মের পথে অগ্রসর হতে হয় আর সেই কল্পনার কাছেই আবেদন জানাতে হয়। রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন, “তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনাজালে”। হিন্দু ধর্মে শুধু ধর্ম নেই; আছে এই সর্বব্যাপি এক সংস্কৃতি আর কাব্য কারণ ঈশ্বর তো কবিও বটে। হিন্দু ধর্মে ঈশ্বরের এস্থেটিক ইমোশন বা শিল্পতাত্তিক অনুভুতির কল্পনা ছাড়া অনেক দার্শনিক প্রশ্নের সমাধান অসম্ভব।
দোহাই ও টোকাটুকিঃ
১/ হিন্দু ধর্ম, ক্ষিতি মোহন সেন, আনন্দ পাব্লিশার্স।
২/ Milford Hamphrey, Travels in Mughal empire, Oxford university press.
৩/ ঈশউপনিষদ


