হিন্দু ধর্ম পাঁচ হাজার বছর ধরে বিবর্তিত ও তৈরি হয়েছে। এই সময়ের সকল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আপন করে নিয়েই হিন্দু ধর্মের বৃদ্ধি হয়েছে। এই ধর্মের কোন একক প্রবর্তক নেই। এমনকি একক কোন প্রামাণ্য গ্রন্থ নেই। বেদ, উপনিষদ, গীতা, রামায়ন, মহাভারত, পুরান, ষড় দর্শন, ভক্তি আন্দোলন পদাবলী এ সমস্তই প্রামাণ্য আকর কিন্তু কোনটি এককভাবে ধর্ম গ্রন্থ নয়।। এই বিচিত্র ভাবনার মধ্যে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েই তফাৎ আছে। তবে অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, যখন ভাবনাগুলি আলাদা তখনো ধর্মীয় ধারনায় রয়েছে আশ্চর্য মিল। তাই শঙ্করের অদ্বৈতবাদ (ব্রম্মই একমাত্র সত্য) আর ভক্তিমার্গের দ্বৈত বাদ (তোমার চরণে কখন ঠাই পাবো) এর মতো আপাত বিপরীত দর্শনও কোন ভয়ংকর সংঘাত সৃষ্টি করেনা।
সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা থেকেই হিন্দু ধর্মের শুরু। এমনকি “হিন্দু” শব্দটি “সিন্ধু” র অপভ্রংশ। সেই সিন্ধু উপত্যকায় কোন উপাসনার মূর্তি পাওয়া যায়নি। বড়ই আশ্চর্য যে হিন্দু ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে নিরাকার দেবতার উপাসনা করেই। এই সিন্ধু সভ্যতার পতন ঘটে খ্রিস্ট পূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর দিকে। নতুন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে এই সিন্ধু সভ্যতার পতন হয়েছে মুলত বৈদিক ঋষিদের নেতৃত্বই। সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তার জল ব্যবস্থাপনার উপরে, সেখানে ছিলো ব্যারেজ, স্লুইস গেইট। এই জল ব্যবস্থাপনাই সমৃদ্ধি ঘটায় সিন্ধুতে কিন্তু আখেরে এই কারণেই অতিবৃষ্টি, খরা, লবনাক্ততা এক ব্যপক জনবিদ্রোহের জন্ম দেয়। সেই বিদ্রোহে বাঁধ গুলো ভেঙ্গে দেয়া হয়। বাঁধ ভেঙ্গে দেয়ার নায়ক বৈদিক ঋষিরা; তাঁদের মাধ্যমেই রচিত হয়েছে বেদ এবং বেদ এর পরে রচিত হয় উপনিষদ।
উপনিষদে গড়ে উঠেছে হিন্দু ধর্মের ঈশ্বর তত্ত্ব। ব্রহ্ম শব্দটি ঈশ্বরের হিন্দু ধর্ম অনুসারে ঈশ্বরের সহি নাম। উপনিষদের দৃষ্টিতে ব্রহ্ম আর আত্মা অভিন্ন। সেই পরম “এক” প্রত্যেক জীবের মধ্যে প্রকাশ করেছেন নিজেকে। “তত্ত্বমসি” মানে তুমিই তিনি। তোমার মাঝেই ঈশ্বর। লৌকিক হিন্দু ধর্মে ঈশ্বরকে নানান মূর্তিতে বা রূপে পুজা করা হয়, তাই হিন্দু ধর্মের ব্রম্মের রূপ না জানলে বিভ্রান্তির অবকাশ থেকেই যায়।
হিন্দু ধর্মে অসংখ্য দেবদেবীর প্রবেশ ঘটেছে ক্রমশ। যে সমস্ত লৌকিক ধর্মকে হিন্দু ধর্ম আত্মস্থ করেছে সেই সব ধর্মের সকল দেবতাকে হিন্দু ধর্ম আত্তীকরণ করে নিয়েছে। এই কাজ সব ধর্মই করে। যেমন বঙ্গের শাকাম্ভরি দেবিকে হিন্দু ধর্ম আত্মস্থ করে তাঁকে দেবী দুর্গায় রুপান্তর করেছে। বৌদ্ধ ধর্মের গৌতম বুদ্ধও হিন্দু ধর্মের অবতার। বৌদ্ধদের পরাজিত ও বিতারন করে হিন্দু ধর্ম বৌদ্ধ আচারকে এইভাবেই আত্মস্থ করে নেবার চেষ্টা করেছে। খুব কৌতূহল উদ্দীপক হচ্ছে হিন্দুদের একটা উপনিষদ আছে নাম “আল্লা উপনিষদ”। বইটি এখনো হাতে পাইনি কিন্তু শুনেছি এটা নাকি ওল্ড টেস্টামেন্ট আর কোরআনের ভারতীয় উপস্থাপন। আল্লা উপনিষদ লেখার কৌশলে এটা পরিষ্কার যে হিন্দু ধর্ম প্রথম দিকে ইসলামকেও আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছে। সেই চেষ্টা সফল হয়নি। কারণ সেমেটিক ধর্ম আর ভারতীয় ধর্ম মৌলিক ভাবে আলাদা। ইসলামকে আত্মস্থ করতে গেলে হিন্দু ধর্মে ব্যাপক ও মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজন ছিলো। সেই সংস্কার হলে তখন আর সেটাকে হিন্দু ধর্ম বলে আদৌ চেনা জেত কিনা সেটা আরেক বিষয়।
যাই হোক, সকল ধর্মই মানুষের কল্যাণের পথ নির্দেশ করেছে। মানুষের কল্যাণ কামনাই প্রকৃত ধার্মিকতা। মানুষের কল্যাণ চিন্তা না থাকলে সেই ধর্ম চিন্তায় বা ধর্ম কর্ম অর্থহীন। সেই প্রকৃত ধার্মিকতায় উজ্জ্বল হোক সবার জীবন। যেই জীবন মানুষ ও প্রকৃতির মঙ্গল কামনায় উৎসর্গিত। প্রকৃতির সংরক্ষণই আজকের ধর্মের প্রধান দাবী। বাঙলার হিন্দুদের শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পুজায় সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই। আনন্দময়ীর আগমনে সকলের জীবন নির্বিঘ্ন আর আনন্দময় হোক।
লেখাটির ফেইসবুক ভার্সন পড়তে চাইলে এইখানে ক্লিক করুন



One Response
হিন্দু নামটি কোথায় থেকে এসেছে বা কারা এ নামটি প্রথম ব্যবহার করেছে। আর সনাতন ও বৈদিক সহ অনেক নাম আছে তাহলে ভারতে হিন্দু ধর্ম নামটি কোথায় থেকে এলো। অনেকে বলে বৃটিশ সরকার নাকি এ নামটি তৈরি করেছে সেটি কি ঠিক