আমি বেশ কিছুদিন আগে লিখেছিলাম, পর্দা প্রথা একচেটিয়া আরবের সংস্কৃতি নয়। ভারতবর্ষে সুদূর অতীত থেকেই পর্দা প্রথা ছিল। এই পর্দা প্রথাকে অনেকে পুরুষতান্ত্রিক জুলুম বলে প্রতিষ্ঠা করতে চান। আমার মনে হয় এই সরলীকৃত পশ্চিমা উপসংহারকে প্রশ্ন করা যায়।
আমাদের ভূখণ্ডে নারীরা প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা এবং তাদের ওপরে কোনো কিছুই চাপিয়ে দেয়া সম্ভব নয়; যদি না তারা নিজেরাই সেটা গ্রহণ করে। তারা নিজেদের মতো প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করে। যদি আপনি সেই ভাষা পড়তে পারেন তাহলে সেই প্রতিরোধের গল্প আপনাকে চমৎকৃত করবে, আপনি নারী সমস্যাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে চাইবেন।
আমি আপনাদের ইতিহাস থেকে নারীদের প্রতিরোধের তিনটে উদাহরণ দেব। পশ্চিমা সংস্কৃতি আমাদের পুরুষদের পোষাক পর্যন্ত বদলে দিয়েছে। আমরা বেশিরভাগ পুরুষেরা আনন্দচিত্তে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই পশ্চিমা পোষাক গ্রহণ করেছি। নারীরা তাদের শাড়ি কিন্তু ছাড়েনি। আর তাদের পোষাক ছাড়েনি কওমি মাদরাসা।
আমরা পশ্চিমের শিক্ষা নিয়েছি পুরোটা, ভ্যালুজ নেয়ার চেষ্টা করেছি, চিন্তা কাঠামো নিয়েছি। সবকিছুই আনক্রিটিক্যালি গ্রহণ করেছি। রান্নাঘর যেহেতু নারীরা সামলায় তাই আমরা পশ্চিমা ফুড বা খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করিনি।
হিন্দুধর্ম পালনে নারীদের নানা বাধা থাকার কারণে, বাংলার নারীরা পরিবার আর সমাজের মঙ্গল কামনায় ব্রত পালনের ঐতিহ্য গড়ে তোলে। শত শত ব্রত পালনই এখন বাংলায় হিন্দু ধর্মের মুল আচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ব্রত পালন অনেকটা শুদ্ধাচার বা রোজা রাখার মত। সারাদিন উপবাসী থেকে শুদ্ধ চিন্তা করে, ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে বাংলার নারীরা এই ব্রত পালন করে। ব্রত পালন করতে যেয়ে সে এক নতুন ধরণের ধর্মচর্চার জন্ম দেয়।
এতো কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমার ওয়ালে আমার অফিসে স্যুটিং হওয়া একটি হিজাবের বিজ্ঞাপন নিয়ে ওঠা আলাপের সূত্রে কিছু কথা বলা। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই, যে আমি আগ্রহভরে বিজ্ঞাপন নির্মাতাকে ডেকে এনে এই বিজ্ঞাপনচিত্রের স্যুটিং করিয়েছি। আমি জানতাম ও না কীসের স্যুটিং হয়েছে। আমার অফিসে এর আগে বিশিষ্ট সেক্যুলার নির্মাতা আবু সাঈদ ভাই একটা নাটকের স্যুটিং ও করেছেন। আমাদের কাজের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে অন্য কেউ যদি করতে চান স্যুটিং আমি অনুমতি দেব। কোনো অসুবিধা নেই।
যাই হোক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সেই হিজাবের বিজ্ঞাপনে একটা ট্যাগ লাইন ছিল, “হিজাব আমার আত্মবিশ্বাস”। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে হিজাব কীভাবে আত্মবিশ্বাস হতে পারে।
এবারে আসুন আমরা লিবারেল দুনিয়ার মূল্যবোধে পোষাক নিয়ে আলোচনা করি। পোষাক কি ব্যক্তির ইচ্ছায় পরিধেয় নাকি, সমাজের ইচ্ছায় নির্ণীত? এটা মনে হতে পারে পোষাকে ব্যক্তির ইচ্ছাই সর্বোচ্চ। এটা ভুল ধারণা। পোষাক আপনার হতে পারে কিন্তু এটা আপনি নিজে দেখেন না, দেখে অন্য সবাই । শুধু আপনি ছাড়া আর সবাই সেই পোষাকে আপনাকে দেখে। অন্যরা আপনার পোষাক দেখতে বাধ্য হয়। আপনার পোষাক তাই অন্যের চোখকে পীড়া দিতে পারবে না। তাই আপনি যা খুশি তাই পরতে পারেন না। অন্যকে সেটা দেখতে হয়। “আমার যা ইচ্ছা তাই পরবো” এইটা একটা ভ্রান্ত ও সমাজবিরোধী আকাঙ্ক্ষা।
তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে। পোষাক নির্বাচনে ব্যক্তির কি কোনো ভূমিকা নাই? আছে, অবশ্যই আছে। এটাই ব্যক্তির সাথে সমাজের নেগোশিয়েশন। সামাজিক সম্মতি উৎপাদন করা। যেটাকে ট্রেন্ড বলা হয়। সেটাই ট্রেন্ড হয়ে ওঠে যার পেছনে সামাজিক সম্মতি আছে।
যারা আমার বয়সী যারা আছেন, তারা হয়তো মনে করতে পারবেন, একসময় বাংলাদেশে কাবুলি ড্রেসের ফ্যাশন শুরু হয়েছিল। প্রবল সামাজিক বাধায় সেই ফ্যাশন চলতে পারেনি।
যেই পোষাকে সামাজিক সম্মতি থাকে সেই পোষাক পরলে তো ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস বাড়বেই। গণমানুষের ইচ্ছার পক্ষে দাঁড়িয়ে যে রাজনীতি করে, ঠিক একইভাবে সে দুর্দান্ত সাহসী হয়।



One Response
দাদা!
আমি আপনার সবগুলো লেখাই নিয়মিত পড়ি। যদি দু’চারদিন অনলাইনে না থাকি তাহলে পরে সেটার কাজা আদায় করে নিই আপনার প্রোফাইলে গিয়ে। আপনার লেখা, বিশ্লেষণ এবং তথ্য ও যুক্তি আমাকে প্রচণ্ড রকম ভাবিয়ে তুলে।